Header AD

সংসদে ‘দুই ভারত’-এর কথা তুলে কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র আক্রমণ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের

সংসদে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানালেন লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে করকাঠামো থেকে SIR, কেন্দ্রের কাছে বকেয়া অর্থ থেকে আমেরিকার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি- বাদ গেল না কিছুই। বাজেট ভাষণের জবাবে তিনি ‘দুই ভারত’ তত্ত্ব তুলে ধরে বলেন, একদিকে দেশ নিজেকে বিশ্বগুরু হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, আবার অন্যদিকে নিজের দেশেরই নাগরিকদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির জন্য সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। তাঁর কথায়, “আমি সেই দুই ভারতের একজন প্রতিনিধি—যেখানে একদিকে ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’-এর কথা বলা হয়, আবার অন্যদিকে মাতৃভাষাকেই সন্দেহের কারণ বানানো হয়। বাংলা বললেই বাংলাদেশি, মাছ খেলেই মোগল তকমা দেওয়া হয়। ‘জয় বাংলা’ বললেই বা ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইলেই অনুপ্রবেশকারী বলে দেগে দেওয়া হয়।”

মঙ্গলবার সংসদে অভিষেকের বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল বাংলার বকেয়া প্রসঙ্গ। কেন্দ্রীয় বাজেটকে ‘ দিশাহীন’ আখ্যা দিয়ে তাঁর অভিযোগ,  রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ আটকে রেখেছে কেন্দ্র। তাঁর দাবি, বাংলার মানুষের প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বকেয়া আজও মেটানো হয়নি। তিনি বলেন, “এটা শুধু টাকার প্রশ্ন নয়, এটা বাংলার মানুষের সম্মানের প্রশ্ন।” ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা, জল জীবন মিশনের মতো প্রকল্পে অর্থ না দেওয়ার বিষয়টিকেও তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। অভিষেকের কটাক্ষ, ‘ পানীয় জল নিয়েও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হচ্ছে। সংবিধানে সকলকে সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না।‘ এমনকী বাজেট ভাষণে বাংলার নাম একবারও না ওঠায় প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অনুপ্রবেশ ও নাগরিকত্ব ইস্যুতেও কেন্দ্রকে কাঠগড়ায় তোলেন অভিষেক। তিনি বলেন, একদিকে সরকার দাবি করে সীমান্ত পুরোপুরি সুরক্ষিত, অথচ দিল্লি বা পহেলগাঁওয়ের মতো জায়গায় কীভাবে সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়ে কীভাবে নির্বিচারে হত্যালীলা চালাচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর নেই। ভোটার তালিকা ও নাগরিকত্ব যাচাই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজ দেশে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দশকের পর দশক ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও তা নাকি যথেষ্ট নয়। তাঁর কথায়, দেশের সেবা করা মানুষ—মন্ত্রী, সাংসদ, ক্রীড়াবিদ এমনকী নোবেলজয়ীরাও আজ নিশ্চিন্ত নন। তাঁদেরকেও নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে শুনানিকেন্দ্রে হাজিরা দিতে হচ্ছে।

বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কমেডিয়ান বীর দাসের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, ‘সম্প্রতি আমেরিকায় এক তরুণ কমেডিয়ান ‘দুই ভারত’-এর কথা বলেছিলেন। অনেকেই সেটাকে নিছক হাস্যরস ভেবেছিলেন, কিন্তু আসলে সেটি ছিল বাস্তবের আয়না। একদিকে বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও প্রচার চলছে। অন্যদিকে প্রতি ১৬ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, এ তো সেই ছবির কথাই বলে।‘ পাশাপাশি জিএসটি, কর কাঠামো, মুদ্রাস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও কেন্দ্রের নীতির সমালোচনা করেন তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা। তাঁর অভিযোগ, ‘ কর আমাদের পিছনে নয়, করের পিছনেই চলে জীবন। একটা শিশুর জন্মের পর থেকে অন্তিম সংস্কার পর্যন্ত শুধু কর আর কর। পুরোটাই একটা করের ফাঁদ।‘ করকাঠামোকে ‘ত্রিপল ট্যাক্স ট্র্যাপ’ কটাক্ষ করে অভিষেক বলেন, ‘একজন মানুষ আয়কর দেন, জিনিস কিনে জিএসটি’ও দেন আবার মুদ্রাস্ফীতির কারণে পরক্ষেও তাঁর পকেটে টান পড়ে। গাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও একই ব্যাবস্থা। গাড়ি কেনার পরেও রোড ট্যাক্স, টোল ট্যাক্সের বোঝা চাপে।‘ আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে দেশের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দাবি করে তাঁর প্রশ্ন, ‘ আমেরিকার এগ্রিকালচারাল সেক্রেটারি এই চুক্তির ফলে ভারতে ব্যবসার ক্ষেত্রে মার্কিন দেশের লাভ হয়েছে বলে সমাজমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন। কেন ভারত এই দাবির বিরোধীতা করল না?’  প্রধানমন্ত্রীর ‘আত্মনির্ভর ভারত’ গড়ে তোলার স্লোগানকে কটাক্ষ করে অভিষেকের চ্যালেঞ্জ, ‘ প্রধানমন্ত্রী আত্মনির্ভর ভারতের কথা বলেন, আমরা স্বনির্ভর বাংলা করে দেখিয়েছি।‘ এভাবেই সংসদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক তোপ দাগেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।