SIR আতঙ্কে ফের এক মহিলার অস্বাভাবিক মৃত্যু। এ বার নদিয়ার কৃষ্ণনগরে আত্মঘাতী হলেন এক বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)। মৃত ওই বিএলও-র নাম রিঙ্কু তরফদার (৫১)। তিনি চাপ়়া বাঙালঝি স্বামী বিবেকানন্দ বিদ্যামন্দিরের পার্শ্বশিক্ষক ছিলেন। শনিবার সকালে বাড়ি থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, ওই ঘর থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে নিজের মৃত্যুর জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছেন তিনি। কাজের অত্যাধিক চাপ সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়ে এমন চরম সিদ্ধান্ত বলে ওই সুইসাইড নোটে লিখে রেখেছেন তিনি। এই নিয়ে সমাজ মাধ্যমে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মৃত বিএলও’র ছবি ও চিঠি পোস্ট করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন,”আর কত মানুষের প্রাণ যাবে? SIR এর জন্য আর কতজনকে মরতে হবে? এই প্রক্রিয়ায় আর কত শবদেহ আমরা দেখব?”
বছর চুয়ান্নর ওই মহিলা ‘সুইসাইড নোটে’ লেখেন, “আমার এই পরিণতির জন্য নির্বাচন কমিশন দায়ী। আমি কোনও রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করি না। খুবই সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই অমানুষিক কাজের চাপ আমি নিতে পারছি না। আমি একজন পার্শ্বশিক্ষিকা। বেতন পরিশ্রমের তুলনায় খুবই কম কিন্তু এরা আমাকে ছাড় দিল না।“ কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন, তার ব্যাখ্যা দিয়ে সুইসাইড নোটে রিঙ্কু লিখেছেন, “অফলাইন কাজ আমি ৯৫ শতাংশ শেষ করে ফেলেছি। কিন্তু অনলাইনে আমি কিছুই পারি না। বিডিও অফিসে এবং সুপারভাইজারকে জানানো সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা করল না। ২০১ নম্বর পার্টে কেউ ছিল না বলে আমায় কাজ চাপিয়ে দিল। কিন্তু পরে অন্য পার্টের অনেককে অন্য পার্টে বিএলও হিসাবে নিয়োগ করেছে।” ‘সুইসাইড নোটে’ সবশেষে লেখেন, “এখন আমার সুখের সময় কিন্তু এরা আমাকে বাঁচতে দিল না। কাজটা অনেকের কথা শুনে রাখতে গেলাম। এখন মনে হচ্ছে ছেড়ে দেওয়াটাই ভালো ছিল। ফোন রেজিস্ট্রেশন হয়ে গিয়েছে বলে ছেড়েও কাজ হতো না।” মৃতার স্বামী অসীম তরফদারের অভিযোগ, “ফর্ম বিলি সঠিক সময়ে করেছে। কিন্তু ডিজিটাল আপলোডের ব্যাপারে কিছু জানত না। বার বার জানিয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। এটা আত্মহত্যা নয়, কমিশনের দ্বারা হত্যা।”

এই ঘটনায় কমিশন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোপ দেগেছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে শাসক শিবিরের দাবি, “নির্বাচন কমিশনের জটিল ডিজিটাল প্রক্রিয়া, অবাস্তব সময়সীমা, শাস্তির আতঙ্ক ও রাতভর তদারকির নামে যে মানসিক নির্যাতন কর্মীদের ওপর চাপানো হচ্ছে— তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। অমানবিক চাপে যখন বিএলও-দের প্রাণ যাচ্ছে, তখন বিজেপি শুধু রাজনৈতিক ফয়দা লুটতে ব্যস্ত। এটাই বিজেপির নিষ্ঠুর, অমানবিক ও দায়িত্বহীন রাজনীতির প্রকৃত চেহারা।”
প্রসঙ্গত, দিনকয়েক আগেই পূর্ব বর্ধমান জেলায় ব্রেন স্ট্রোক হয়ে মৃত্যু হয় বিএলও নমিতা হাঁসদার। তাঁর পরিবারের তরফে দাবি করা হয়েছিল, অত্যধিক কাজের চাপেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। বুধবার ভোরে জলপাইগুড়ির মাল ব্লকের নিউ গ্লেনকো চা বাগান এলাকায় শান্তিমুনি ওঁরাও নামের এক বিএলও-র ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। সে ক্ষেত্রেও অভিযোগ ওঠে যে, কাজের চাপে আত্মঘাতী হয়েছেন ওই তরুণী। অন্য দিকে, এসআইআর-এর কাজ করতে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে কলকাতা মেডক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন হুগলির কোন্নগরের এক বিএলও। এই আবহে নির্বাচন কমিশনকে দুষেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তাঁর অভিযোগ, কমিশনের ‘অপরিকল্পিত কাজের’ জন্য একের পর এক মৃত্যু ঘটছে বাংলায়। তিনি এসআইআরের কাজ বন্ধ রাখার জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠিও দিয়েছেন।
পাশাপাশি বিজেপি শাসিত গুজরাত থেকেও SIR আতঙ্কে এক বিএলও’র অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর এসেছে। গিরের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন অরবিন্দ ভাধের। তাঁর এলাকায় এসআইআর কাজের জন্য বিএলও হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, গত কয়েক দিন স্কুল সামলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনুমারেশন ফর্ম বিলি করছিলেন অরবিন্দ। শুধু তা-ই নয়, ভোটারদের ফর্ম পূরণ হয়ে গেলে, তা সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে অনলাইনে আপলোড করা সবই করতে হচ্ছিল। তা নিয়ে মানসিক চাপে ছিলেন অরবিন্দ। শুক্রবার সকালে নিজের ঘর থেকে অরবিন্দের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের দাবি, দেহের পাশে একটি সুইসাইড নোটও পাওয়া গিয়েছে। মৃতের স্ত্রীর দাবি, ওই নোটে নিজের মৃত্যুর জন্য এসআইআর-কে দায়ী করেছেন অরবিন্দ।





