রাজ্যকে না জানিয়ে দার্জিলিং-এর গোর্খাল্যান্ড নিয়ে আলোচনার জন্য ‘ইন্টারলোকিউটর’ বা মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করা নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত চরমে উঠল। কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘অসাংবিধানিক’, ‘বেআইনি’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর নির্লজ্জ আঘাত’ বলে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে (Narendra Modi) ফের কড়া ভাষায় চিঠি লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। সোমবার, নবান্ন থেকে পাঠানো এই চিঠিতে, অবিলম্বে এই ‘স্বৈরাচারী’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। চিঠিতে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, গত ১০ নভেম্বর থেকে কেন্দ্রের নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে যে কাজ শুরু করেছেন, সেই খবর অত্যন্ত বিস্ময়কর ও হতাশাজনক। রাজ্যের আবেদন কার্যত উড়িয়ে, কোনও প্রত্যুত্তর না দিয়ে কেন্দ্র যে ফের একতরফা সিদ্ধান্ত কার্যকর করল, তা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী বলে চিঠিতে মনে করিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
দার্জিলিং, কালিম্পং ও তরাই-ডুয়ার্সের পাহাড়ি অঞ্চলের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ ঘিরে বহুদিন ধরেই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত চলছে। গত অক্টোবর মাসে প্রাক্তন উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার পঙ্কজ কুমার সিং-কে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিয়োগ করায় এই বিরোধ চরমে ওঠে। এই নিয়োগ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লেখেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তার পরেও নিজের অবস্থানে অনড় থাকে কেন্দ্র। গত ১০ নভেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বিজ্ঞপ্তি জারি করে মধ্যস্ততাকারীর কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
নবান্ন সূত্রে খবর, চিঠির শুরুতেই মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করা নিয়ে আগের চিঠির উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন , এই নিয়োগের আগে রাজ্য সরকারের সাথে কোনওরকম আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়নি। তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার পরেও বিষয়টিকে উপেক্ষা করেছে কেন্দ্র। এই পদক্ষেপকে “সম্পূর্ণ একতরফা এবং স্বৈরাচারী” বলে নিন্দা করেছেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। চিঠিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, “দার্জিলিং পশ্চিমবঙ্গের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।” এই অঞ্চলটি ‘গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) অ্যাক্ট, ২০১১’ দ্বারা পরিচালিত হয়, যেটি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, ‘উক্ত আইনে “সরকার” বলতে স্পষ্টতই পশ্চিমবঙ্গ সরকারকেই বোঝানো হয়েছে।তাঁর জোরালো অভিযোগ, এই পরিস্থিতিতে দার্জিলিং-এর মতো রাজ্যের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করার কোনও সাংবিধানিক এক্তিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের নেই।’ তিনি ১০ই নভেম্বরের এই আদেশকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।
তাঁর মতে, এই পদক্ষেপ সংবিধানের ষষ্ঠ, সপ্তম এবং একাদশ তফসিলে বর্ণিত কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতা বিভাজনের নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। শুধুমাত্র আইনি নয়, রাজনৈতিকভাবেও কেন্দ্রকে বিঁধেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি এই পদক্ষেপকে “যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর নির্লজ্জ হানা”এবং “সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো”-র চেতনার উপর আক্রমণ বলে বর্ণনা করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, ২০১১ সাল থেকে রাজ্য সরকারের নিরন্তর প্রচেষ্টায় দার্জিলিং, কালিম্পং এবং কার্শিয়াং-এর অশান্ত পরিস্থিতি সামাল দিলে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে এনেছে এবং ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। তাঁর আশঙ্কা, কেন্দ্রের এই নতুন পদক্ষেপ আসলে পাহাড়ের “শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঘটনা”। প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করে এই “স্বৈরাচারী” আদেশটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।





