স্বামী চৈতন্যানন্দ সরস্বতী উত্তরপ্রদেশের আগ্রার একটি হোটেল থেকে স্বঘোষিত ‘বাবা’ স্বামী চৈতন্যানন্দ সরস্বতীকে গ্রেফতার করল পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তিকর মেসেজ পাঠানো, যৌন হেনস্তা এবং কটু মন্তব্য করার অভিযোগ তোলে দিল্লির একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৭ জন পড়ুয়া। গত কয়েকদিন ধরেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন স্বামী চৈতন্যানন্দ সরস্বতী ওরফে স্বামী পার্থসারথি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলেও এত দিন অধরাই ছিলেন তিনি। ৬২ বছর বয়সি চৈতন্যানন্দের বিরুদ্ধে ‘লুক আউট’ নোটিসও জারি করা হয়েছিল। অবশেষে রবিবার ভোর সাড়ে ৩টে নাগাদ আগ্রার এক হোটেল থেকে ধরা পড়েছেন দিল্লির বসন্ত কুঞ্জ এলাকার শ্রী শারদা ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ান ম্যানেজমেন্ট নামে আশ্রমের ওই স্বঘোষিত ‘বাবা’। ইতিমধ্যেই তাঁর ভলভো গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানাচ্ছে, গাড়িতে নকল নম্বর প্লেট লাগানো ছিল।দিল্লির বসন্ত কুঞ্জ এলাকায় একটি ম্যানেজমেন্ট কলেজের ডিরেক্টর ছিলেন চৈতন্যানন্দ ওরফে পার্থসারথি। এফআইআর-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁর নির্দেশে ছাত্রীদের হস্টেলে স্নানঘরের সামনে ক্যামেরা বসানো হয়। দাবি করা হতো, নিরাপত্তার স্বার্থে এই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। কিন্তু ছাত্রীদের অভিযোগ, ক্যামেরার মাধ্যমে ছাত্রীদের স্নানের দৃশ্য দেখতেন তিনি। এ ছাড়াও হস্টেলের ঘরে ছাত্রীরা কী কী করছেন, সব কিছুর উপর নজরদারি চালাতেন ‘বাবা’। চৈতন্যানন্দ ওরফে পার্থসারথীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা প্রথম হয়েছিল ২০০৯ সালে। সেবার তাঁর বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপ এবং প্রতারণার অভিযোগও উঠেছে। পরে ২০১৬ সালেও এক মহিলা তাঁর বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলেছিল। এবার ফের অভিযোগ, এবং তা অনেক বড় আকারে। একে একে ১৭ মহিলা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই যে আশ্রমের সঙ্গে ওই ‘বাবা’ যুক্ত সেই শ্রী শ্রীঙ্গেরি মঠও বাবার সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করেছে।দিল্লির এই ‘বাবা’ আদতে ওড়িশার বাসিন্দা। অভিযোগ উঠেছে গত ১৬ বছর ধরে একের পর এক মহিলার শ্লীলতাহানি করেছেন তিনি। এক ছাত্রীর দাবি, চৈতন্যানন্দ তরুণীদের বিভিন্ন আপত্তিকর প্রশ্ন করতেন। জিজ্ঞাসা করতেন, তাঁদের কতজন প্রেমিক রয়েছে? সঙ্গমের সময় তরুণীরা কি কন্ডোম ব্যবহার করেন? তরুণীদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চৈতন্যানন্দ ‘বেবি’ বলে সম্মোধন করতেন বলে জানা গিয়েছে। স্বঘোষিত এই ‘বাবা’র বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে। তিনি প্রত্যেক ছাত্রীদের স্নানের সময় জানতে চাইতেন। অপর এক ছাত্রীর দাবি, চৈতন্যানন্দ বেশিরভাগ সময়ই মহিলাদের দেহের গড়ন, তাঁদের পোশাক এবং চুলের প্রশংসা করতেন। এরপরই তাঁদের দিকে ছুঁড়ে দিতেন কু-ইঙ্গিত। আরও এক ছাত্রী দাবি করেছেন, হোলির সময়ে চৈতন্যানন্দ প্রতিটি ছাত্রীর গালে, মুখে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে রং লাগাতেন। নির্দেশ ছিল, ছাত্রীদের মুখে তিনি-ই প্রথম রং লাগাবেন। এখানেই শেষ নয়। নানা অছিলায় রাতে ছাত্রীদের নিজের কোয়ার্টারে ডেকে পাঠাতেন ওই ‘বাবা’। তারপর তাঁদের অশালীনভাবে স্পর্শ করতেন বলেও অভিযোগ করেছেন এক তরুণী। আরও অভিযোগ, রাত বাড়লেই ছাত্রীদের হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করা শুরু করতেন চৈতন্যানন্দ। ছাত্রীদের বেশির ভাগই অভিযোগ তুলেছেন, তাঁদের গভীর রাতে মেসেজ পাঠিয়ে ‘বাবা’ বলতেন, ‘বেবি, আই লভ ইউ।’ ‘আই অ্যাডোর ইউ’। ‘সুইটি আই লাইক ইউ’। এ ছাড়াও তাঁর নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার জন্য জোরজবরদস্তি করা হতো বলে অভিযোগ। এমনকি ‘বাবা’র প্রস্তাব না-মানলে ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো।ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তদন্তে নেমে চৈতন্যানন্দের বেশ কয়েকটি ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের হদিস পেয়েছে দিল্লি পুলিশ। শুধু তা-ই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হওয়ার পরেও ওই অ্যাকাউন্ট থেকে ‘বাবা’ ৫৫ লক্ষ টাকা তুলেছেন বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। অভিযোগ ওঠার পরেই ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সংস্থা শ্রী শ্রীনগেরি মঠ চৈতন্যানন্দকে ডিরেক্টরের পদ থেকে সরিয়ে দেয়। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দিল্লির একটি আদালতে মামলাও করেন মঠ কর্তৃপক্ষ। আশ্রমের পক্ষে পেশ করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে ‘স্বামী চৈতন্যানন্দ সরস্বতী, যিনি স্বামী পার্থসারথী নামেও পরিচিত, তিনি এমন কিছু কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন যা বেআইনি, অনুচিত। আর সেই কারণেই পীঠের তরফে তাঁর সঙ্গে সমস্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।’





