দীর্ঘ ১৩ বছর শয্যাশায়ী অবস্থায় থাকা দিল্লির যুবক হরীশ রানার জন্য পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যুর (প্যাসিভ ইউথানেশিয়া) অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের মধ্যে এই ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির বলে মনে করা হচ্ছে। হরীশের বাবা-মায়ের আবেদনের ভিত্তিতে আদালত তাঁর জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি, নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে একটি স্পষ্ট আইন প্রণয়নের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে ভাবনার পরামর্শও দিয়েছে আদালত।
হরীশ রানা প্রায় ১৩ বছর ধরে কোয়াড্রিপ্লেজিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী। তাঁর শরীরের কোনও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করে না, এমনকি বাইরের জগৎ বা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও তাঁর কোনও সচেতনতা নেই। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে পরোক্ষ মৃত্যুদানের অনুমতি দেওয়া যায় কি না তা খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্ট নয়ডা জেলা হাসপাতালের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামলার শুনানি হয়। মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার পর আদালত রায় সংরক্ষিত রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করে।
রায় দিতে গিয়ে বিচারপতিরা উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর বিখ্যাত উক্তি “টু বি অর নট টু বি”-র উল্লেখ করেন। আদালত জানায়, ভারতে প্রত্যক্ষ বা অ্যাকটিভ ইউথানেশিয়া আইনত নিষিদ্ধ হলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে পরোক্ষ ইউথানেশিয়ার অনুমতি দেওয়া যায়। আদালতের মতে, দুইটি বিষয় বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে— প্রথমত হরীশের চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা এবং দ্বিতীয়ত রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ। মেডিক্যাল বোর্ডও জানিয়েছে, তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতির কোনও সম্ভাবনা নেই এবং কৃত্রিম খাবার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা বন্ধ করাই এই পরিস্থিতিতে যুক্তিযুক্ত।
হরীশ পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলের পাঁচতলা থেকে পড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত পান তিনি। ঘটনার পর থেকেই তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় অচেতন অবস্থায় কাটাতে হয়েছে তাঁকে এবং সবকিছুর জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
বিচারপতিরা হরীশের বাবা-মায়ের ত্যাগ ও সংগ্রামের প্রশংসা করে বলেন, গত ১৩ বছর তাঁরা নিরলসভাবে সন্তানের পাশে থেকেছেন। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, হরীশকে দিল্লির এইমসে ভর্তি করে একটি নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে এবং মর্যাদা বজায় রেখে তাঁর লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করতে হবে।
এই মামলায় ২০১৮ সালের ‘কমন কজ বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলার ঐতিহাসিক রায়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে। সেই রায়ে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।




