ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করে দেশছাড়া করা হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার মধ্যরাত থেকেই ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান শুরু করেছে আমেরিকা। ভেনেজুয়েলার আকাশে এয়ার স্ট্রাইক করে আমেরিকা। মধ্যরাতেই ভেনেজ়ুয়েলার রাজধানী কারাকাসে পর পর সাত বার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। হামলার খবর পাওয়া যায় সে দেশের মিরান্ডা, আরাগুয়ার মতো প্রদেশেও। এই হামলার নেপখ্যে কে বা কারা, প্রথমে তা পরিস্কার হচ্ছিল না। সম্ভাব্য মার্কিন হানা নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখনই মাদুরোকে দেশছাড়া করার কথা ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চূড়ান্ত লঙ্ঘন’ বলে অভিযোগ তুলে আমেরিকার বিরুদ্ধে সরব হল ইরান। হামলার নিন্দা করেছে রাশিয়া, কুবার মতো দেশও।
উত্তেজনা চলছিল গত কয়েকমাস ধরেই। শুক্রবার স্থানীয় সময় অনুযায়ী মধ্যরাতে যাবতীয় আশঙ্কা সত্যি করে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট, পরিস্থিতি অনেক আগেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। বর্তমানে সারা দেশজুড়ে এমার্জেন্সি জারি রয়েছে। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে ট্রাম্প লিখেছেন, “ভেনেজ়ুয়েলা এবং তার নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সাফল্যের সঙ্গে বড় মাত্রার অভিযান চালিয়েছে আমেরিকা। মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে বন্দি করা হয়েছে। তাঁরা দেশ ছেড়েছেন।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার অভিযোগ তুলেছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আসলে মাদক কারবারিদের সর্দার। এই হামলার আগে কয়েক মাস ধরেই ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক তৎপরতা চলছিল। সেনা মোতায়েন, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ পাঠানো—সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে এক ধরনের অঘোষিত যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আসলে আমেরিকার অজুহাত। আসলে ট্রাম্পের নজর বিশ্বের অন্যতম বড় তৈলখনির দিকে। হামলার নিন্দা করে ভেনেজুয়েলা সরকারের অভিযোগ, ‘এই হামলা আসলে মার্কিন আগ্রাসনের একটি ঘৃণ্য উদাহরণ। এদের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করা।‘
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর বিরুদ্ধে ড্রাগ পাচার ও সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ করে আসছে। মাদুরো বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে এই অভিযোগকে সামনে রেখেই সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার জলসীমায় ড্রাগ বহনকারী নৌকার ওপর একের পর এক অভিযান চালানো হয়। গত মাসে ভেনেজুয়েলা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলের আকাশসীমা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় তেল ট্যাঙ্কার চলাচলে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। মাদক পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি ২০২৪ সালে নির্বাচনে জিতে প্রেসিডেন্ট হওয়া মাদুরোকে স্বীকৃতি দেয়নি আমেরিকা। ধীরে ধীরে সেই অভিযানের পরিধি সামরিক আক্রমণের দিকে গড়ায়। জেনে নেওয়া যাক, কেন হঠাৎ ট্রাম্পের রোষানলে পড়ে আগুন জ্বলে উঠল লাতিন আমেরিকায়?
আসলে বিশ্বের বৃহত্তম খনিজ তেলের ভাণ্ডার হল ভেনিজুয়েলা। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে দৈনিক প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন হয়। ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার পরেও এর উৎপাদন চমকে দেওয়া মতো। এখানে তেলের মজুত রয়েছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল যা সৌদি আরবের চেয়েও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকার নজর রয়েছে এই দেশে। কিন্তু বামপন্থী নেতা মাদুরো আমেরিকার অঙ্গুলিহেলনে হাঁটার লোক নন। ক্ষমতায় আসার পরই চিন এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান তিনি। এই ঘটনা আমেরিকার জন্য সিঁদুরে মেঘ। অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার সম্পদ কুক্ষিগত করার লক্ষ্যেই আসলে এই হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। ভেনেজুয়েলার তরফেও দাবি করা হয়েছে, লক্ষ্য যদি মাদক বন্ধ হয়, তাহলে তেলের ট্যাঙ্কারগুলিকে কেন টার্গেট করছে আমেরিকা? এগুলি ধ্বংস করার একটাই উদ্দেশ্য ভেনেজুয়েলার আয়ের সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে আর্থিকভাবে দেশটিকে আমেরিকার পায়ের তলায় নিয়ে আসা। এবং সেখানে মার্কিন সমর্থিত সরকার বসানো।




