মহারাষ্ট্রের পুণেতে নিহত বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকের পুরুলিয়ার বাড়িতে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। শুক্রবার দিল্লি থেকে ফিরেই পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন অভিষেক। তার মধ্যেই পুনেতে নিহত পরিযায়ী শ্রমিক সুখেন মাহাতোর দেহ তার গ্রামে নিয়ে আসা হয়। দেহ ফিরতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তার পরিবারের সদস্যরা। নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে যারা এই ঘটনায় যুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান। নিহতের আরও দুই ভাই-ও পুণেতে কাজ করেন। এই ঘটনার পর আর ভিনরাজ্যের কর্মস্থলে ফিরে যেতে চান না তাঁরা। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ওই দুই ভাইয়ের চাকরির আর্জি জানাবেন বলেও আশ্বাস দেন অভিষেক।

এদিন অভিষেক নিহতের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, “কোনও রাজনৈতিক মন্তব্য করব না। তবে মৃতের পরিবারকে যা আইনি সহযোগিতা করতে লাগে করব।” এরপরই তিনি বলেন, “২০০৯ সাল থেকে নিহত ও তাঁর দুই ভাই ওই কোম্পানিতে কাজ করছে। প্রতিদিন সাড়ে তিনটের শিফট থাকত সুখেন মাহাতোর। ওইদিন তিনটে নাগাদ কাজে যাবে বলে বেরিয়েছিল। সন্ধ্যায় দাদা ফোন করেন সুখেনকে। ফোনে পাননি। এরপর পুলিশ ফোন করে জানায় সুখেন অসুস্থ। দাদা গিয়ে দেহ দেখতে পান। শরীরে একাধিক জায়গায় ক্ষতচিহ্ন। তাতেই স্পষ্ট খুন করা হয়েছে। কীভাবে মারা গিয়েছেন সুখেন বলতে পারব না। তবে আমার বিশ্বাস প্রকৃত তদন্তে সে তথ্য উঠে আসবে।”

মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবারকে আইনিভাবে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন অভিষেক। তিনি বলেন, “আমি শুনেছি এখনও পর্যন্ত ১জনকে গ্রেপ্তার করেছে। আরও কয়েকজন যুক্ত রয়েছে। যারা এর সঙ্গে যুক্ত যাতে তারা জেলের পর যেন বেল না পান, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে যেতে হলে যাব। দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতেই হবে।” এই প্রসঙ্গে পুণে থেকে পুরুলিয়ায় দেহ ফেরানোর ক্ষেত্রে কীভাবে সেখানকার তৃণমূল নেতারা মৃতের দাদার পাশে দাঁড়িয়েছে, সেকথাও তুলে ধরেন অভিষেক। তিনি বলেন, “পুণে থেকে দেহ ফেরানো নিয়ে সমস্যা হয়। সেখানকার পুলিশ একবার বলছে ময়নাতদন্ত হবে। একবার বলছে থানায় যেতে হবে। আমরা খবর পাওয়ামাত্র অভিভাবকের মতো ওঁর দাদার পাশে এসে দাঁড়াই। দেহ ফেরানোর জন্য অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করি। কীভাবে মারা গিয়েছেন সুখেন তা এখনও ঠিকভাবে বলতে পারব না। তবে আমার বিশ্বাস প্রকৃত তদন্তে সে তথ্য উঠে আসবে।”
সুখেনের ভাইয়েরা ইতিমধ্যেই অভিষেককে জানিয়েছেন, তাঁরা আর মহারাষ্ট্রে ফিরে যেতে চান না , এদিন তা উল্লেখ করেই তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বলেন, ‘আমরা দলগতভাবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং আমাদের দলনেত্রীর কাছে তাঁদের হয়ে আবেদন রাখব , দু’ভাইয়ের যেন চাকরি বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আমাদের মানবিক রাজ্য সরকার যত দ্রুত সম্ভব এখানেই করে দেন। যাতে তাঁরা পুরুলিয়ার মাটিতেই থাকতে পারেন।’
সুখেনের অস্বাভাবিক মৃত্যু রহস্যের তদন্ত দ্রুততার সঙ্গে করত হবে বলে দাবি জানিয়ে হুঁশিয়ারিও দেন অভিষেক। তিনি বলেন, “আগামী দশদিনের মধ্যে দোষীরা ধরা না পড়লে দুই বা তিনজন বিধায়ককের সঙ্গে পরিবারের কিছু সদস্যকে নিয়ে ৬-৭ জনের একটি প্রতিনিধিদল মহারাষ্ট্রে পাঠানো হবে।” এরপরও মহারাষ্ট্র প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে না পারলে ৫০ দিনের মধ্যে তিনি নিজে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন অভিষেক। পাশাপাশি বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় মাহাতোর কাছে অভিষেক আর্জি জানান, “অন্ততপক্ষে একবার মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করবেন বিজেপি সাংসদ। আর পুরুলিয়ার কুড়মি যুবক খুনের তদন্তের দাবি জানাবেন। বলবেন, আমরা এর বিচার চাই।” শেষে তিনি বলেন, সুখেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে আগামীকাল, শনিবার জেলার প্রত্যেক বিধানসভার ব্লক ও টাউনে ৩-৪ টের মধ্যে প্রতিবাদ মিছিল হবে।
প্রসঙ্গত, পুলিশ সূত্রে খবর, সোমবার রাতভর নিখোঁজ থাকার পরে মঙ্গলবার সকালে পুনের শিকরাপুর থানা এলাকার কোরেগাঁও ভীমায় একটি ফাঁকা জায়গা থেকে সুখেনের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়। তিনি পুরুলিয়ার বরাবাজার থানা এলাকার তুমড়াশোলের টোলা বাঁধডি গ্রামের বাসিন্দা। মৃতের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। ওই আঘাতের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ডেথ সার্টিফিকেটে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার বৈভব তিওয়ারি বলেন, ‘পুনের এসপি-র সঙ্গে একাধিক বার কথা হয়েছে। কিন্তু খুনের মোটিভ তাঁদের কাছেও স্পষ্ট নয়। ক’জনকে তাঁরা সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন।’প্রান্তিক কৃষক পরিবারের সন্তান সুখেন ও তাঁর দুই ভাই কোরেগাঁও ভীমা এলাকার গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। কারখানা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তিন ভাই।




