আবারও ভিনরাজ্যে রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার বাংলার এক পরিযায়ী শ্রমিক। মৃতের নাম অনাদি মাহাতো। বাড়ি পুরুলিয়া জেলার ঝালদা দু’নম্বর ব্লকের খৈরি গ্রামে। মঙ্গলবার কর্ণাটকের বেঙ্গালুরু থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে পরিবার ও এলাকায়। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতদেহ উদ্ধারের পরেও মঙ্গলবার ময়নাতদন্ত না হওয়ায় সন্দেহ বাড়তে থাকে বাড়ির লোকজনের মধ্যে। মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হওয়ায় তাঁরা দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানান। এরপর পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল ট্রেড ইউনিয়নের জেলা সভাপতি উজ্জ্বল কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন পরিবারের সদস্যরা। উজ্জ্বলবাবু বিষয়টি তৎক্ষণাৎ দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়র কার্যালয়ে জানান। অভিযোগ, প্রাথমিকভাবে প্রশাসনিক জটিলতায় দেহ পাঠানো ও ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হস্তক্ষেপ করতেই বুধবার অনাদি মাহাতোর ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে খবর।
জানা গিয়েছে, বেঙ্গালুরু থেকে ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে বিমানে মৃতদেহ নিয়ে আসা হবে। সেখান থেকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে পুরুলিয়ার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে অনাদি মাহাতোর দেহ। ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে ভিনরাজ্যে কর্মরত বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে। পরিবারের দাবি, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ দ্রুত প্রকাশ করা হোক এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলেই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মিলবে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, অনাদি দীর্ঘ সাত-আট বছর ধরে বেঙ্গালুরুর একটি নির্মাণ সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। সোমবার রাত ১১ টা থেকে প্রায় ১২ টা পর্যন্ত স্ত্রী প্রীতিলতা মাহাতোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন অনাদি। ৩ বছরের ছেলে ও ৬ বছরের মেয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। ভোরে ফের ফোন করবেন বলে জানান। কিন্তু তারপর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে সহকর্মীরা তাঁকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে প্রীতিলতা জানান, “ ও প্রতিদিন ভোরবেলা রান্না করে কাজে যেত। তাই রাতে কথা বললেও ভোর ৪ টার সময় আমাকে ফোন করত। মঙ্গলবার ভোরে ফোন করেনি। ফলে আমার সন্দেহ হয়েছিল। ওর ফোনে যোগাযোগ করলেও পাইনি। পরে সহকর্মীদের ফোন থেকে জানতে পারি, ওর শরীর অসুস্থ। তারপরেই ফোনে জানানো হয়, আমার স্বামী মারা গিয়েছে। যে মানুষটা রাত পর্যন্ত কথা বলল, সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। কয়েকঘণ্টার মধ্যে কী এমন হয়ে গেল? আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।”
খৈরি গ্রামে প্রীতিলতা ৩ বছরের ছেলে ও ৬ বছরের মেয়ে এবং বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে থাকেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন মৃত পরিযায়ী অনাদি। মৃতের শ্যালক ঝালদা ১ ব্লকের কলমা গ্রাম পঞ্চায়েতের রাইডি গ্রামের বাসিন্দা বিষ্ণু মাহাতো বলেন, ”এই মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য আছে। গত দেড় থেকে দু’বছর হল একটি অন্য কোম্পানিতে জামাইবাবু নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছিলেন। আমরা ঠিক জানি না বেঙ্গালুরুর কোন এলাকায় তিনি থাকতেন। কোম্পানিটি ঠিক কোথায় সেটিও জানা নেই। খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি।” শেষবার পুজোর সময় বাড়ি এসেছিলেন অনাদি। তারপর অক্টোবরের শেষদিকে বেঙ্গালুরুতে ফিরে যান। আবারও ভোট দিতে বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হল না।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে মঙ্গলবার রাতেই পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধি দল মৃত পরিযায়ী শ্রমিক অনাদি মাহাতোর বাড়ি পৌঁছায়। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন রাজ্য তৃণমূলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক এবং পুরুলিয়া জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান, প্রাক্তন মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো এবং তৃণমূল ট্রেড ইউনিয়নের পুরুলিয়া জেলা সভাপতি উজ্জ্বল কুমার। তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি বোঝেন এবং প্রয়োজনে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। এদিন উজ্জ্বল কুমার বলেন, ‘‘পরিবারের লোকজন বিষয়টি জানানোর পরেই আমি আমাদের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয়ে যোগাযোগ করি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপেই আজ মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হবে। তারপর সেখান থেকে বিমানে ঝাড়খণ্ডের রাঁচি পর্যন্ত মৃতদেহ নিয়ে আসা হবে। সেখান থেকে আমরা অ্যাম্বুলেন্স আনার ব্যবস্থা করছি। আমরা আবার ওই শ্রমিকের বাড়িতে যাব। ওই পরিবারের পাশে আছি। ওদের সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।”





