বিশ্বজুড়ে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীর অধিকার, সম্মান ও সাফল্যকে স্বীকৃতি জানাতেই প্রতি বছর ৮ মার্চ এই দিনটি উদযাপিত হয়। ২০২৬ সালের নারী দিবসের থিম “Give and Gain”। এই বিশেষ দিনে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানিয়ে সমাজ সংসারে তাঁদের অবদানের কথা তুলে ধরলেন। পাশাপাশি নারী সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও স্মরণ করালেন তিনি।
নারী দিবস উপলক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কবিতাও পোস্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে তিনি লিখেছেন—
“আমার লক্ষ্মী আজকের দিনে সবারে করে আহ্বান,
আমার লক্ষ্মী ক্লান্তি ভুলে গায় জীবনের জয়গান।”পাশাপাশি নারী দিবসে বাংলায় নারীশক্তির ক্ষমতায়নের বার্তা দিয়ে পোস্ট করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ পোস্টে বাংলার ইতিহাসে নারীদের অবদানের কথাও স্মরণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার (Pritilata Waddedar), মাতঙ্গিণী হাজরা (Matangini Hazra),কল্পনা দত্ত (Kalpana Datta),বীণা দাস (Bina Das), সুনীতি চৌধুরি (Suniti Choudhury) থেকে শুরু করে মানবসেবায় নিবেদিত মাদার টেরেসা (Mother Teresa)— সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি লিখেছেন, ‘আমি কুর্নিশ জানাই এই বাংলার মাটিকে – এ মাটি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মাটি, এ মাটি মাতঙ্গিনী হাজরার মাটি, এ মাটি কল্পনা দত্ত, বীণা দাশ, সুনীতি চৌধুরীর মাটি, এ মাটি মাদার টেরিজার মাটি।’
একই সঙ্গে নারী উন্নয়নে রাজ্য সরকারের পদক্ষেপের কথাও এদিন পোস্টে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই শুভক্ষণে একটা বিশেষ কাজ আমরা করেছি। ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে টাকা দেবার কথা ছিল আগামী এপ্রিল মাস থেকে। আজকের দিনে যুবসমাজকে সম্মান জানিয়ে গতকাল থেকেই ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের টাকা দেওয়া আমরা শুরু করেছি। গতকাল থেকেই প্রায় ১ কোটি আবেদনকারীর ব্যাঙ্ক একাউন্টে টাকা যাওয়া শুরু হয়ে গেছে। আমি সকলকে জানাই উষ্ণ অভিনন্দন।’
এই পোস্টেই কেন্দ্র সরকারের সমালোচনাও করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষকে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের সংসারে প্রভাব ফেলছে বলে তিনি দাবি করেন। ‘আমরা সবসময় চেষ্টা করি এভাবেই সর্বস্তরের, সকল মানুষের পাশে থাকতে। আর অন্যদিকে, কেন্দ্র সরকারের কাজ শুধু মানুষকে হয়রানি করা। গ্যাসের দাম যেভাবে বৃদ্ধি করা হল, তার প্রভাব পড়বে মানুষের হেঁসেলে।’
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের অবদান অপরিসীম। তাই তাঁর কাছে শুধু একটি দিন নয়, বছরের প্রতিটা দিনই নারী দিবস। তাঁর কথায়, ‘যে সমাজে মেয়েরা ভালো থাকে না, সেই সমাজ কখনও ভালো থাকতে পারে না।’ নারী কল্যাণে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার (Lakshmir Bhandar)-এর কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর কথায়, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে উপভোক্তার সংখ্যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪১ লক্ষ। ভাতার পরিমাণও আবার ৫০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে – তপশিলী জাতি ও আদিবাসী পরিবারের মহিলারা এখন মাসে ১৭০০ টাকা এবং অন্যান্যরা মাসে ১৫০০ টাকা করে পাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে স্মার্টকার্ডটি পরিবারের মহিলা সদস্যের নামে। প্রায় ২ কোটি ৪২ লক্ষ মহিলা এই কার্ড পেয়েছেন।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় – সব স্তরেই মেয়েরা কন্যাশ্রী পাচ্ছে। ১ কোটি ছাত্রী এখন কন্যাশ্রী। UNESCO তে সেরার শিরোপা পেয়ে ‘কন্যাশ্রী’ বিশ্বজয়ী।
রূপশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২৩ লক্ষ মহিলাকে বিবাহের জন্য এককালীন ২৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সবুজসাথী প্রকল্পে রাজ্যের ছাত্র-ছাত্রীদের ১ কোটি ৪৮ লক্ষ সাইকেল দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৭৯ লক্ষ মেয়েদের জন্য।
মা–বোনেদের ও শিশুদের স্বাস্থ্যরক্ষায় আমাদের সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ করা হয়েছে। মাদার এন্ড চাইল্ড হাব হয়েছে ১৭টি। গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ১৩টি ওয়েটিং হাট হয়েছে। এসবের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৬৮.১% থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৯.১৪%।’
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সোশ্যাল মিডিয়ায় বার্তা দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। তিনি বাংলার সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং রাজনীতিতে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
নিজের পোস্টে তিনি লেখেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সেই সব নারীদের শক্তি ও দৃঢ়তাকে সম্মান জানানো উচিত, যাঁরা আমাদের সমাজকে গড়ে তোলেন। তাঁর মতে, বাংলায় নারীর প্রতি সম্মান শুধুমাত্র প্রতীকী নয়, এটি সংস্কৃতির অঙ্গ। আমরা মা দুর্গাকে কন্যা হিসেবে পুজো করি— এই ভাবনাই বাংলার সমাজচিন্তার ভিত্তি।
পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, গত পনেরো বছর ধরে একজন নারী বাংলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তাঁর সাহস ও দৃঢ়তা গোটা দেশের সামনে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তাঁর মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নারী ক্ষমতায়ন শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়; বাস্তবে লক্ষ লক্ষ মহিলার জীবনে মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার পথ খুলে দিয়েছে।
অভিষেকের কথায়, বাংলার প্রকৃত শক্তি রাজ্যের নারীদের মধ্যেই নিহিত। তাঁদের সাহস, সংগ্রাম এবং সাফল্যই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ার অনুপ্রেরণা দেয়।





