মঙ্গলবার রাতে অন্ধ্রের উপকূলে কাকিনাড়া বন্দরের কাছে স্থলভাগে আছড়়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় মন্থা। উত্তর পশ্চিম অভিমুখ এখন এই ঘূর্ণিঝড়ের। যা ধীরে ধীরে শক্তি হারিয়ে সাধারণ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার কথা। রাতভর তাণ্ডব চলেছে অন্ধ্র ও ওড়িশায়। সঙ্গে ভারী বৃষ্টি। ওড়িশায় এই ঝড়ের তাণ্ডবে মারা গিয়েছেন এক ব্যক্তি। আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে খবর, আগামী কয়েক ঘণ্টায় ঘূর্ণিঝড় আরও দুর্বল হয়ে পরিণত হতে পারে গভীর নিম্নচাপে।
ঘূর্ণিঝড় মন্থার তাণ্ডবলীলায় বিস্তর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অন্ধ্র ও ওড়িশায়। অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রীর দফতর জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় মন্থার প্রভাবে অন্ধ্রে প্রায় এক লক্ষ ৭৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এছাড়াও দক্ষিণ-মধ্য রেলে বাতিল হয়েছে অন্তত ১২২টি ট্রেন। বহু ট্রেনের সময়সূচিও পরিবর্তন করা হয়েছে।
আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, পূর্ব-মধ্য আরব সাগরে গুজরাত উপকূলের কাছে আর একটি শক্তিশালী নিম্নচাপ ঘনাচ্ছে। উত্তর-পূর্ব রাজস্থানেও রয়েছে একটি ঘূর্ণাবর্ত। তবে এগুলি স্থলভাগে প্রবেশের সম্ভাবনা কম। মন্থা আপাতত শক্তি হারিয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ছত্তীসগড়ের দিকে এগবে। এর প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গে ঝড় না হলেও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ভারী বৃষ্টি হবে বেশির ভাগ জেলায়। দক্ষিণবঙ্গে বেশ কিছু জেলায় চলছে বৃষ্টি ।এছাড়াও, উত্তাল থাকবে সমুদ্র। মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। ইতিমধ্যেই বৃষ্টির জেরে উত্তরের পার্বত্য এলাকায় ধস নামতে পারে বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। পাশাপাশি ক্ষতি হতে পারে ফসলের।
আগামী দু’দিন দক্ষিণবঙ্গে জারি হয়েছে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা। কলকাতা-সহ দক্ষিণের সব জেলাতেই বুধবার কমবেশি ঝড়বৃষ্টি হবে। তবে উপকূলবর্তী চার জেলা উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরে ভারী বৃষ্টি (৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার) হতে পারে। বাকি জেলাগুলিতে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ দুর্যোগের পাশাপাশি ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইবে। বৃহস্পতিবার ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। শুক্রবারও দুই বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় ঝড়বৃষ্টি চলতে পারে।
দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে উত্তরবঙ্গেও। বুধবার জলপাইগুড়ি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। বৃহস্পতিবার সব জেলাতেই ভারী বৃষ্টি হতে পারে। শুক্রবার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে অতি ভারী বৃষ্টি (৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার)-র আশঙ্কা রয়েছে। জারি হয়েছে কমলা সতর্কতা। বাকি জেলাগুলিতেও ভারী বৃষ্টি চলবে। শনিবার বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে।
সংবাদ সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, ঝড়ে গাছ পড়ে অন্ধ্রের কোনাসিমা জেলার মাকানাগুড়েম গ্রামে মৃত্যু হয়েছে এক মহিলার। এখনও পর্যন্ত ৭৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গড়া হয়েছে ২১৯টি স্বাস্থ্যশিবির। অন্ধ্রের পাশাপাশি মন্থার প্রভাব পড়েছে ওড়িশাতেও। রাতভর ভারী বৃষ্টিতে দক্ষিণ ওড়িশার বেশ কিছু জায়গায় ধস নেমেছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বেশি অনুভূত হয়েছে মালাকানগিরি, কোরাপুট, রায়গড়, গজপতি, গঞ্জাম, কান্ধামাল, কালাহান্ডি এবং নবরংপুর জেলায়। ওড়িশার অন্তত ১৫টি জেলায় কমবেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একাধিক জায়গায় ধস নেমে বন্ধ হয়ে গিয়েছে রাস্তা। কোথাও উপড়ে গিয়েছে গাছ, ভেঙেছে ঘরবাড়ি। গজপতি জেলার মোহানায় একটি মাটির বাড়ি ভেঙে পড়ে এক জন গুরুতর জখম হয়েছেন। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবিলায় রাজ্যে ২ হাজারের বেশি আশ্রয়শিবির তৈরি করা হয়েছে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (ওডিআরএএফ) এবং দমকল মিলিয়ে মোট ১৫৩টি উদ্ধারকারী দলকে মোতায়েন করা হয়েছে। ন’টি জেলায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল কলেজ।