পশ্চিমবঙ্গে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে নিপা ভাইরাস। সোমবার বারাসতের এক বেসরকারি হাসপাতালের দুই স্বাস্থ্যকর্মী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। খেজুর গুড়ে ভয় নেই, যত আতঙ্ক খেজুর রসে। সূত্রের খবর, আক্রান্তরা খেজুরের রস খেয়েছিলেন। সেখান থেকেই ছড়িয়ে থাকতে পারে নিপা ভাইরাস। কল্যাণীর এইমস হাসপাতাল থেকে ইতিমধ্যেই আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে বলেই খরব। এরপরেই বারাসতের যশোররোড সংলগ্ন রথতলা এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে দুই স্বাস্থ্যকর্মীকে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা চলছে। এই ঘটনার পর কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে – এই পরিস্থিতিতে রাজ্যকে সর্বাত্মক প্রযুক্তিগত, পরিকাঠামোগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হবে। সম্ভাব্য সংক্রমণ রুখতে কোনও রকম ঘাটতি রাখা হবে না বলেই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন নাড্ডা। আলোচনায় কেন্দ্র–রাজ্যের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কেন্দ্র ও রাজ্য একসঙ্গে কাজ করবে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে। নিপা মোকাবিলায় জাতীয় স্তরে একটি যৌথ আউটব্রেক রেসপন্স টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এই দলের কাজ হবে রাজ্য সরকার ও স্থানীয় স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিস্থিতি মূল্যায়ন, সংক্রমণের উৎস খোঁজা এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আক্রান্ত দু’জনেই পেশায় নার্স। একজনের বাড়ি বর্ধমানে। অন্যজন পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা। দুজনেরই আনুমানিক বয়স ২৫ বছর। দু’জনে অ্যাকিউট এনসেফ্যালাইটিস সিনড্রোমে আক্রান্ত বলেই হাসপাতাল সূত্রে খবর। এর সংক্রামক হিসেবে বলা হচ্ছে, জ্বরের সঙ্গে ভুল বকা, পরিচিতকে চিনতে না পারার মতো সমস্যাও ছিল। এরপরেই দু’জনের নমুনা কল্যাণী এইমসে পাঠানো হয়। রিপোর্ট পজিটিভ আসে। যদিও এই বিষয়ে আরও নিশ্চিত হতে দিল্লির ল্যাবেও নমুনা পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে দু’জন নার্স নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পৌঁছতেই নড়েচড়ে বসেন জেলা এবং রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা। নিপা সংক্রমণের খবর সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। ল্যাবরেটরি সহায়তা জোরদার করা হয়েছে, নজরদারি বাড়ানো হয়েছে সংক্রমণ-প্রবণ এলাকাগুলিতে। একই সঙ্গে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সমস্ত প্রোটোকল কার্যকর করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বাদুড় বা বাদুড়ের বিষ্ঠার সংস্পর্শে আসা ফল খেলে বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে এই রোগ হতে পারে। আক্রান্ত শূকর বা বাদুড়ের থেকেও সরাসরি মানুষের শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। এই রোগের উপসর্গগুলি হল, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, প্রবল মাথার যন্ত্রণা, বমি বমি ভাব, কাফ মাসলে ব্যথা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখমণ্ডলের পেশি সঙ্কুচিত হওয়া। এই প্রসঙ্গে বারাসত সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমএসভিপি অভিজিৎ সাহা বলেন, ”কল্যাণী এইমস থেকে দুজনের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়ার জন্যই আক্রান্তদের নমুনা দিল্লিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
সোমবার ১২ জানুয়ারি থেকেই বিষয়টি নিয়ে নবান্ন ও রাজ্য সরকার সম্পূর্ণভাবে সতর্ক বলে জানিয়েছেন মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী। কী ভাবে ওই দুই নার্স সংক্রমিত হলেন, তাঁরা কাদের কাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন – এই সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মুখ্যসচিব জানিয়েছেন, গোটা পরিস্থিতির উপর সরাসরি নজর রাখছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের একটি বিশেষ দল বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করেছে। নিপা সংক্রমণের খবর সামনে আসতেই রাজ্যের তরফে দুটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে – ০৩৩ ২৩৩৩ ০১৮০ এবং ৯৮৭৪৭০৮৮৫৮। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলির জন্যও আলাদা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর তৈরি করা হচ্ছে।





