সাহিত্যজগতে ইন্দ্রপতন। ফুরলো তিন ভুবনের কথা- প্রয়াত সাহিত্যিক মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় ওরফে শঙ্কর (Shankar)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২। বেশ কিছুদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন এই বর্ষীয়ান কথা সাহিত্যিক। শুক্রবার দুপুরে শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আপামর বাঙালির কাছে স্বামী বিবেকানন্দকে ঘরের মানুষ করে তুলেছিল তাঁর লেখনী। যাঁর কলম থেকে ‘কত অজানারে’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’-র মতো সৃষ্টি পেয়েছে পাঠক, তাঁর প্রয়াণে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হল সাহিত্য জগতে। শঙ্করের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)।
গত ডিসেম্বরে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল বর্ষীয়ান সাহিত্যিকের। সেই সময়ও তাঁকে ভর্তি হতে হয়েছিল হাসপাতালে। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। এর পর ফের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। শুক্রবার তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাঙালি পাঠক, সাহিত্যিকমহল এবং বাংলা বিনোদনদুনিয়া। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সাহিত্যিকের প্রয়াণে শোকবার্তায় জানিয়েছেন, ‘বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। ‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’ থেকে ‘জনঅরণ্য’—তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীর আধারে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না-বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাঁর প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও অগণিত গুণগ্রাহীকে আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই।’
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক শংকরের সাহিত্যজীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। অল্পবয়সে লেখা ‘কত অজানারে’ তাঁকে পাঠকমহলে বিপুল পরিচিতি এনে দেয়। সেই বইয়ের সাফল্যই যেন তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যপথের ভিত্তি রচনা করেছিল। ১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্মগ্রহণ করেন মণিশঙ্কর। শৈশব খুব সহজে কাটেনি —অল্প বয়সেই বাবাকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। জীবিকার তাগিদে কখনও কেরানির কাজ, কখনও হকারি—জীবনের কঠিন বাস্তবের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। সেই সূত্রেই তিনি কাজ করার সুযোগ পান কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল (Noel Frederick Barwell)-এর অধীনে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য রচনা ‘কত অজানারে’, যা বাংলা সাহিত্যে নতুন এক কণ্ঠস্বরের আগমনী বার্তা দেয়।
তবে প্রকৃত অর্থে ঘরে ঘরে শংকরকে পৌঁছে দেয় তাঁর অনন্য উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’। কলকাতার অভিজাত শাহজাহান হোটেলকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এক মাইলফলক। ২০১২ সাল পর্যন্ত এর ১১১টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে—যা বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিরল সাফল্য। এরপর একের পর এক উপন্যাসে তিনি পাঠকদের উপহার দিয়েছেন বৈচিত্র্যময় জীবনচিত্র—‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’, ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘সম্রাট ও সুন্দরী’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’, ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’—প্রতিটি রচনাই তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। শংকরের সাহিত্য শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বড় পর্দাতেও তা সাফল্যের সঙ্গে রূপ পেয়েছে। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এছাড়াও ‘চৌরঙ্গী’ অবলম্বনে নির্মিত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে স্যাটা বোসের ভূমিকায় অভিনয় করেন মহানায়ক উত্তমকুমার। এই প্রসঙ্গে শংকর একবার বলেছিলেন, “সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।” আবার একালের পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় শঙ্করের ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস নিয়ে ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ ছবিটি তৈরি করেন।
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে শংকর পেয়েছেন বহু সম্মাননা ও স্বীকৃতি। ২০২১ সালে ‘একা একা একাশি’ উপন্যাসের জন্য অর্জন করেন সাহিত্য অকাদেমি (Sahitya Akademi)পুরস্কার। তার আগেই ১৯৯৩ সালে ‘ঘরের মধ্যে ঘর’-এর জন্য লাভ করেন বঙ্কিম পুরস্কার।
তাঁর লেখা ‘বোধোদয়’ প্রকাশের পর তিনি বিশেষ প্রশংসা পান সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (Sharadindu Bandyopadhyay)-এর কাছ থেকে। তিনি শংকরকে উৎসাহ দিয়ে লিখেছিলেন—“ব্রাইট, বোল্ড, বেপরোয়া।” এমনকি উপন্যাসটি পড়ে মন্তব্য করেছিলেন, “তোমার এই লেখায় জননী-জন্মভূমিকেই আমি সারাক্ষণ উপলব্ধি করলাম।” পরে শংকর নিজেও স্বীকার করেন, সমালোচনা ও প্রশংসা—দুইয়ের মিশ্রণই তাঁকে আরও পরিণত করেছে।
সত্তরের অশান্ত কলকাতাকে পটভূমি করে লেখা ‘স্থানীয় সংবাদ’, ‘সুবর্ণ সুযোগ’ প্রভৃতি উপন্যাস নিয়ে প্রকাশিত ‘জন্মভূমি’ সংকলনের সম্প্রতি ১০২তম সংস্করণ বেরিয়েছে—যা তাঁর দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে পাঠকমনে নিজের আসন অটুট রেখেছেন শংকর। সংগ্রামমুখর জীবন থেকে উঠে এসে যিনি সাহিত্যকে দিয়েছেন এক অনন্য বাস্তবতার ভাষা—তিনি আজও বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।





