গণধর্ষণ নয়। দুর্গাপুরের ডাক্তারি পড়ুয়ার ধর্ষক একজনই। নির্যাতিতার জবানবন্দি এবং ঘটনার পুনর্নিমাণের পর প্রাথমিকভাবে এমনটাই জানাল আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট। মঙ্গলবার ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন নির্যাতিতার সহপাঠীও। তাঁর ভূমিকা নিয়েও উঠছে একধিক প্রশ্ন। মঙ্গলবার রাতে দুর্গাপুর কমিশনারেট জানিয়েছিল, ‘নির্যাতিতা’র সহপাঠীও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন। তাঁকে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সিপি সুনীলকুমার চৌধুরীর এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরেই গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। ঘটনার দিন এই সহপাঠী-বন্ধুর সঙ্গেই ক্যাম্পাসের বাইরে বেরিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন দ্বিতীয় বর্ষের ডাক্তারি ছাত্রী। তদন্তে নেমে রবিবার ও সোমবার মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, এই পাঁচ জনেরই ডিএনএ পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে। এখন রিপোর্টের অপেক্ষায় তদন্তকারীরা। নির্যাতিতা ও তাঁর সহপাঠীরও মেডিক্যাল পরীক্ষা করা হবে। দুর্গাপুর কাণ্ডের নির্যাতিতা’র সহপাঠী-বন্ধুকে বুধবার দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে হাজির করানো হয়েছিল। বিচারক সাত দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। এদিন তাঁর হয়ে দুর্গাপুর আদালতের কোনও আইনজীবী সওয়াল করেননি। সুপ্রিম কোর্টের আইন অনুযায়ী, দুর্গাপুর মহকুমা আইনি সহায়তা কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এক জন অভিযুক্ত সহপাঠীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ আইকিউ সিটি হাসপাতালের পিছনে পরানগঞ্জের শ্মশান কালীমন্দির যাওয়ার রাস্তায় জঙ্গলের ভিতর অকুস্থলে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হয়। ছিলেন আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশের ডিসি (পূর্ব) অভিষেক গুপ্ত, এসিপি (দুর্গাপুর) সুবীর রায়, সিআই (এ) রণবীর বাগ প্রমুখ। হাসপাতালে নির্যাতিতার গোপন জবানবন্দিও নেওয়া হয়। এরপরই সন্ধ্যার দিকে সহপাঠীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গণধর্ষণের অভিযোগের তদন্তে নেমে নির্যাতিতার সহপাঠীকে আটক করে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ করছিল পুলিশ। তদন্তকারী সূত্রে খবর, মালদার এই বাসিন্দা যুবক তদন্তে সহযোগিতা করলেও মাঝেমধ্যেই পুলিশকে ‘মিসগাইড’ করছিল। যুবকই অভিযুক্তদের শনাক্ত করেছে। আবার ওই যুবকই প্রথমে নির্যাতিতার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। সেই ঘটনা আবার নির্যাতিতা নিজে বারবার আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি নির্যাতিতা-সহপাঠীর সঙ্গে সম্পর্কের কোনও কথা আড়াল করার চেষ্টা করছেন?
পুলিশ জানিয়েছে, নির্যাতিতার বয়ান অনুযায়ী একজনই ধর্ষণ করেছে। বাকিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অকুস্থলে বাকি যারা ছিল, তাদের বিরুদ্ধেও ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী গণধর্ষণের মামলা দেওয়া হয়েছে। ছিনতাই হওয়া মোবাইলও উদ্ধার হয়েছে। বুধবার সকালে ধৃত শেখ নাসিরউদ্দিন ও শেখ রিয়াজুদ্দিনকে নিয়ে বিজড়ায় তাদের বাড়িতে যায় পুলিশ। সেখান থেকে তাদের ঘটনার রাতে পরনের পোশাক সংগ্রহ করা হয়। এর আগে আরও তিন ধৃতের পোশাকও বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। সহপাঠীর পোশাকও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সব পোশাকই ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ঘটনায় অভিযুক্ত সফিক শেখকে তার দিদির সাহায্যে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জানা গিয়েছে, পুলিশ খুঁজছে জানার পরই বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায় সফিক। নিজের মোবাইল ব্যবহার করাও বন্ধ করে দেয়। এরপরই রোজিনা বিবি ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে ফোন করেন। জানান, সফিক ফোন করলেই যেন তাঁকে জানানো হয়।এরপরই ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে পারেন রোজিনা। ভাইকে দেখা করার প্রস্তাব দেন। দিদির কথায় রাজি হয়ে অন্ডাল হাইওয়ের নীচে যায় সফিক। এদিকে পুলিশের গাড়িতেই সেখানে পৌঁছন রোজিনা। ভাইকে তুলে নেন গাড়িতে। সেখানেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে সফিককে। রোজিনার কথায়, “অন্যায়ের সঙ্গে আপস নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। দোষীরা যেন শাস্তি পায়।”
দুর্গাপুর কাণ্ডে গত ১০ অক্টোবর থেকে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। উত্তরবঙ্গ যাওয়ার আগে দুর্গাপুরের ঘটনা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, কোনও অভিযুক্তকে রেয়াত করা হবে না। গত শুক্রবার রাত ৯টা নাগাদ এক সহপাঠীর সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছিলেন ওই তরুণী। অভিযোগ, সেই সময়েই তাঁকে স্থানীয় জঙ্গলে টেনে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে খবর, ‘নির্যাতিতা’ এখন আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ রয়েছেন। ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন তিনি। এ দিকে ‘নির্যাতিতা’র বাবা সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। যদিও পুলিশের কাজে গাফিলতির কথা সে ভাবে তাঁকে বলতে শোনা যায়নি।





