সোমবার সকালে বিশ্বজয়ের ট্রফি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার ছবি পোষ্ট করে গোটা বিশ্বকে ‘গুড মর্নিং’ করলেন জেমাইমা রডরিগেজ। রবিবার দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে অধরা স্বপ্নপূরণ হয়েছে ভারতীয় মহিলা দলের। তা যেন এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না ভারতের সোনার মেয়ে জেমাইমা, স্মৃতি মান্ধানারা। বহুকাঙ্ক্ষিত সেই বিশ্বকাপ ট্রফি তাঁরা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সেই ছবি ইতিমধ্যেই ভাইরাল। প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ। বোঝাই যাচ্ছে, সেই ঘোর এখনও কাটেনি। অথচ একটা সময় হারের হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপে বেশ ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিল ভারত। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নতুন ইতিহাস লিখল ভারত। রবিবার বিশ্বকাপ জয়ের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু , প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বহু বিশিষ্টজন। রাষ্ট্রপতি এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘ভারতীয় দলের সব সদস্যকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন। প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতে তারা ইতিহাস তৈরি করেছে। তাদের যা প্রতিভা ও পারফরম্যান্স, বিশ্বকাপ জয় তারই ফল। এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি মহিলা ক্রিকেটকে আরও উচ্চতর জায়গায় নিয়ে যাবে। মেয়েরা যেভাবে ভারতকে গর্বিত করেছে, তা প্রশংসনীয়।’ প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘মহিলাদের ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে অসাধারণ জয় পেল ভারতীয় দল। আত্মবিশ্বাস ও প্রতিভার আদর্শ উদাহরণ এই পারফরম্যান্স। গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে ধারাবাহিকতা ও দলগত সংহতি দেখিয়েছে এই দল। আমাদের প্লেয়ারদের অভিনন্দন। ঐতিহাসিক জয় ভবিষ্যতের চ্যাম্পিয়নদের উদ্ধুদ্ধ করবে।’ অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘বিশ্বকাপ ফাইনালে উইমেন ইন ব্লুয়ের অসাধারণ জয়ে আজ গোটা দেশ গর্বিত। যে লড়াই ও কর্তৃত্ব তারা গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে দেখিয়েছে, তা তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। তোমরা প্রমাণ করেছ যে তোমরা বিশ্বমানের দল এবং তোমরা কিছু অসাধারণ মুহূর্ত উপহার দিয়েছ। তোমরা আমাদের হিরো। ভবিষ্যতে আরও জয় আসুক। আমরা তোমাদের পাশে আছি।’
সোমবার সকালে দু’টি ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন জেমাইমা। হোটেলের ঘরে ট্রফি নিয়ে শুয়ে থাকা সেই ছবিতে জেমাইমার সঙ্গে দেখা যায় ওপেনার স্মৃতি মন্ধানাকেও। ক্যাপশনে লেখা, ‘গোটা বিশ্বকে সুপ্রভাত।’ অন্য ছবিতে জেমাইমা-সহ স্মৃতি মন্ধানা, অরুন্ধতী রেড্ডি, রাধা যাদবদেরও দেখা গিয়েছে। সেই ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘এখন যেন স্বপ্ন দেখছি।’ ২০০৫ এবং ২০১৭। দু’বারই অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়েছে বিশ্বকাপ। মুম্বই তো মায়ানগরী। কত অধরা স্বপ্ন সফল হয় এখানে। মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ২০১১ সালে ২ এপ্রিল ওয়ানডে বিশ্বকাপ হাতে তুলেছিল মহেন্দ্র সিং ধোনির ভারত। রবিবারের তারিখও ছিল ২। ২ নভেম্বর। অবশেষে তৃতীয় বারের চেষ্টায় শাপমুক্তি ভারতের। ঘরের মাঠে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল তারা। ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫২ রানে হারাল। প্রথমে ব্যাট করে ভারত ৭ উইকেট হারিয়ে ২৯৮ রান করে। জবাবে ৪৫.৩ ওভারে ২৪৬ রানে অল আউট হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ব্যাটে-বলে নজর কাড়লেন শেফালি বর্মা ও দীপ্তি শর্মা। তাঁরাই যথাক্রমে ওম্যান অব দ্য ম্যাচ ও সিরিজ। এই দুই ক্রিকেটারের দাপটে ট্রফি তুললেন হরমনপ্রীতেরা।
প্রতিকা রাওয়াল চোটে ছিটকে যাওয়ায় সেমিফাইনালের আগে দলে নেওয়া হয়েছিল শেফালি বর্মাকে। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে রান না পেলেও ফাইনালে নিজের জাত চেনালেন শেফালি। শতরানের জুটি করেন ভারতের দুই ওপেনার। পুরুষ ও মহিলাদের ক্রিকেট মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বকনিষ্ঠ ওপেনার হিসাবে শতরান করলেন তিনি। পুরুষদের ক্রিকেটে এত দিন এই রেকর্ড ছিল বীরেন্দ্র শেওয়াগের দখলে। শেফালি নিজের আদর্শ মনে করেন শেওয়াগকে। সেই গুরুকেই ছাপিয়ে গেলেন আজ। পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে এক দিনের বিশ্বকাপে কোনও ভারতীয় ওপেনার হিসাবেও সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেললেন শেফালি। আগের ম্যাচে দুই নায়ক জেমাইমা রদ্রিগেজ় ও অধিনায়ক হরমনপ্রীত এই ম্যাচে রান পাননি। ভারতের ইনিংস সামলান দীপ্তি ও রিচা ঘোষ। মাঝে একটা সময় ভারতের রান রেট কমে গিয়েছিল। রিচা সেই রান রেট আবার বাড়িয়ে দেন। শেষপর্যন্ত ৫০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ২৯৮ রান করে ভারত।

ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে রান তাড়া করা তুলনামূলক ভাবে সহজ। দেখে মনে হচ্ছিল, অন্তত ৩০ রান কম হয়েছে। বিশেষ করে শিশির পড়ায় বোলারদের কাজ আরও কঠিন হয়ে যায়। ভারতকে খেলায় ফেরাল ফিল্ডিং। কিন্তু ভারতের গ্রাউন্ড ফিল্ডিং এই ম্যাচে দুর্দান্ত হল। প্রতিটি রান বাঁচানোর জন্য নিজেদের উজার করে দিলেন হরমনপ্রীতরা। সরাসরি থ্রোয়ে ২৩ রানের মাথায় ব্রিটসকে রান আউট করলেন আমনজ্যোৎ কৌর। তারপর একটা সময় ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিল উলভার্ট সুনে লুসের জুটিকে। তখনই ফাটকা খেললেন হরমনপ্রীত। বল তুলে দিলেন শেফালির হাতে। এর আগে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোট ১৪ ওভার বল করেছিলেন শেফালি। সেই শেফালি প্রথম ওভারেই সুনে লুসকে ফিরিয়ে দিয়ে ভারতকে খেলায় ফেরান। পরের ওভারে মারিজ়ান কাপকে আউট করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আরও বড় ধাক্কা দেন তিনি।
যত ক্ষণ লরা উলভার্ট ক্রিজ়ে ছিলেন, তত ক্ষণ স্বস্তি পাচ্ছিলেন না হরমনপ্রীত কৌর। সেমিফাইনালের পর ফাইনালেও শতরান করলেন উলভার্ট। কিন্তু দলকে জেতাতে পারলেন না তিনি। ১০১ রানের মাথায় ছক্কা মারতে গিয়ে আউট হলেন উলভার্ট। ক্যাচ ধরতে গিয়ে বল হাত থেকে ছিটকে গিয়েছিল আমনজ্যোতের। শরীরের ভারসাম্য হারালেও বল তালুবন্দি করেন তিনি।
উলভার্ট আউট হওয়ার পরেও আশা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ক্লোয়ি ট্রিয়ন ও নাদিন ডি ক্লার্কের জুটি ভারতকে হারিয়েছিল। এই ম্যাচে তা হল না। দু’জনকেই ফেরালেন দীপ্তি। বিশ্বকাপ ফাইনালে অর্ধশতরানের পাশাপাশি ৩৯ রানে ৫ উইকেট নিলেন তিনি। ম্যাচের শেষ ক্যাচ ধরলেন অধিনায়কে। হরমনপ্রীতের ক্যাচে বিশ্বজয় করল ভারত। সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, বুধবার ৫ নভেম্বর হরমনপ্রীতদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।





