২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনের আবহে SIR নিয়ে উত্তপ্ত রাজ্য-রাজনীতি। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে জল গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। শুধু তাই নিয়ে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে রাজ্যের মানুষের হয়ে সওয়াল করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Baneerjee)। তার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনকে (Election Commission Of India) নোটিশ জারি করল সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি এসআইআর শুনানির ক্ষেত্রে কমিশনকে আরও সংবেদনশীল হওয়ার নির্দেশ দেয় দেশের শীর্ষ আদালত।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের এজলাসে বেলা ১টার কিছু পর শুরু হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা এসআইআর মামলার শুনানি। যেখানে ‘পার্টি ইন পার্সন’ হিসেবে প্রধান বিচারপতির সামনে বাংলার মানুষের হয়রানির কথা তুলে ধরেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই মামলার শুনানিতেই নির্বাচন কমিশনকে নোটিস জারি করার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের সহানুভূতিশীল হওয়াও নির্দেশও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এছাড়াও এসআইআর-এর শুনানিতে মাইক্রো অবজার্ভারদের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামী সোমবার ৯ ফেব্রুয়ারি ফের এই মামলার শুনানি হবে৷

বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চে এসআইআর সংক্রান্ত তিনটি মামলার শুনানি হয় ৷ তার মধ্যে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই৷ আরেকটি মামলা ছিল কবি জয় গোস্বামীর৷ এই মামলায় নির্বাচন কমিশনকে হলফনামা জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলির বেঞ্চ৷
এদিন প্রথমে মমতা করা মামলার সওয়াল করেন আইনজীবীরাই। যদিও তখন সামনের সারিতে আসেননি মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু শুনানি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আসন পরিবর্তন করে সামনের সারিতে চলে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময়ে ভার্চুয়ালি শুনানিতে উপস্থিত হন বর্ষীয়ান আইনজীবী কপিল সিব্বল। মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী হিসাবে প্রথমে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেন শ্যাম দিওয়ান। আদালতে তিনি জানান, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের বাকি আর মাত্র ১১ দিন। ৪ দিন বাকি আছে শুনানি শেষ হওয়ার। ‘অ্যানম্যাপড’হিসাবে ৩২ লক্ষ ভোটারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান বলেন, “এখনও ৬৩ লক্ষ মানুষের শুনানি বাকি আছে। এই অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে শুনানি করতে হলে প্রতি দিন ১৫.৫ লক্ষ শুনানি করতে হবে।” যা অসম্ভব বলে দাবি করেন আইনজীবী। পাশাপাশি, মাইক্রো অবজার্ভারদের নিয়োগ করা নিয়েও আদালতে অভিযোগ জানান তিনি। এছাড়া কী কারণে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির জন্য ডাকা হচ্ছে, সেটা সামনে আনার আবেদন করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী কপিল সিব্বলের সওয়ালের মাঝে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে সওয়াল করতে চান। এই অবস্থায় রাজ্যের অবস্থা কী তা ব্যাখ্যা দিতে প্রধান বিচারপতির কাছে সময় চেয়ে নেন মুখ্যমন্ত্রী। তখন তাঁকে সওয়াল করার সুযোগ করে দেন বিচারপতিরা। এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিচারপতিদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আমরা বিচার পাচ্ছি না। আমি ৬ বার চিঠি লিখেছি জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে। একবারও চিঠির উত্তর পাইনি। সাধারণ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছি, গোটা পরিস্থিতি বলতে পারি।” শুধু তাই নয়, বাংলায় চলা এসআইআর প্রক্রিয়া শুধু নাম কাটার জন্য বলেও আদালতে অভিযোগ জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপরই নাম বিভ্রাটে কীভাবে ভোটার হেনস্তা, জানতে চাইলেন প্রধান বিচারপতি। সেই সময় মমতার আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান বলেন, কারও পদবি গাঙ্গুলী, রে বা চ্যাটার্জি। ২০০২ ভোটার তালিকা বাংলায় রয়েছে। ইংরাজি তর্জমায় বানান বদলে গিয়েছে। তাই এই বিভ্রাটকে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির তালিকায় রাখা যায় না। তখনই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “৫৮ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে ৷ এদিকে তাঁদের আবেদন জানানোর কোনও সুযোগ দেওয়া হয়নি ৷ শুধু বাংলাকেই টার্গেট করা হয়েছে ৷ পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বুলডোজ করার জন্য ৷ লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সিতে নাম যেন বাদ দেওয়া না-হয় ৷ মাইক্রো অবজারভার নয়, জেলা আধিকারিক এবং ইআরও সেগুলির সমাধান করুন ৷” এ প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বলেন: আধিকারিক থাকলে আর মাইক্রো অবজারভারের প্রয়োজন হবে না৷ বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনাদের আধিকারিকদের সংবেদনশীল হতে বলুন৷” শুনানি শেষে মুখ্যমন্ত্রী বেঞ্চের উদ্দেশে বলেন, “দয়া করে মানুষের অধিকার রক্ষা করুন ৷”
জানা গিয়েছে, আগামী সোমবার ফের সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলার শুনানি হবে। রাজ্য এবং কমিশন দুই পক্ষকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। কী কী পদক্ষেপ করছে কমিশন, জানাতে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের সহানুভূতিশীল হতেও নির্দেশ দিয়েছে আদালত। অন্যদিকে এসআইআর প্রক্রিয়ায় কত অফিসার দিতে পারবে রাজ্য, তা জানানোর নির্দেশ দিয়েছে নবান্নকে।





