ভোটের তিন দিন আগে থেকে ব্যক্তিগত মোটরবাইক চলাচলে নির্বাচন কমিশনের (ECI) জারি করা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছে কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। টানা দু’দিনের শুনানির পর শুক্রবার বিচারপতি কৃষ্ণা রাও কমিশনের ২০ এপ্রিলের বিজ্ঞপ্তি খারিজ করে দেন। আদালত নির্দেশ দেয়, ২৯ এপ্রিল সকাল সাতটায় ভোটগ্রহণ শুরুর ১২ ঘণ্টা আগে থেকে এই বিধিনিষেধ কার্যকর করা যাবে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, ভোট শুরুর ১২ ঘণ্টা আগে থেকে মোটরবাইকে ডবল ক্যারি নিষিদ্ধ থাকবে। তবে চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি, পারিবারিক অনুষ্ঠান বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে—যেমন স্কুলপড়ুয়া শিশুদের আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে—এই নিয়ম খাটবে না।
এছাড়া অ্যাপ-ভিত্তিক বাইক পরিষেবা, অ্যাপ-নির্ভর ফুড ডেলিভারি এবং হোম ডেলিভারি সংস্থাগুলির কাজেও কোনওরকম বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। যথাযথ পরিচয়পত্র বহন করলে অফিসগামী রাইডারদের ক্ষেত্রেও এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না বলে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে। এবিষয়ে বিচারপতি রাও জানান, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোটের যুক্তিতে ব্যক্তিগত মোটরবাইক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারির কারণ আদালতের বোধগম্য নয়। তাঁর মতে, নিরপেক্ষতা বা নিরাপত্তার অজুহাতে এ ধরনের সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যুক্তিসঙ্গত নয়। তবে বাইক মিছিল বন্ধ করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে যুক্তি রয়েছে বলেই মনে করেছে আদালত। সেই কারণে ওই নির্দেশে কোনও হস্তক্ষেপ করেনি কোর্ট।
বৃহস্পতিবারের পর শুক্রবারও শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, ঠিক কোন আইন বা বিধির ভিত্তিতে টানা তিন দিন ব্যক্তিগত মোটরবাইক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। প্রায় তিন ঘণ্টার শুনানিতেও এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি কমিশন। বিচারপতি আরও প্রশ্ন তোলেন, একজন সাধারণ নাগরিককে কেন তাঁর কর্মস্থলের প্রমাণ দেখাতে হবে? একজন দোকানের কর্মী বা প্রাইভেট টিউটর কীভাবে সেই প্রমাণ দেবেন? এই ধরনের নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নিয়েও ভাবার পরামর্শ দেন তিনি। রাজ্যের তরফে অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত বলেন, ‘পৃথিবীর সব কিছু নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিশনের আছে, ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু কমিশন তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আধার সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে যে কোনও কিছু নিয়ন্ত্রণের রাস্তায় হাঁটছে।’
কমিশনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, অতীতের অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন রিপোর্টের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, বাইক-বাহিনী নিয়ে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। মোটরবাইক ব্যবহার করে অপরাধ করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও রয়েছে—পিলিয়নে বসে নাকা এড়িয়ে পালানো সহজ বলেও তারা উল্লেখ করে। কমিশনের আইনজীবী জানান, এ বিষয়ে রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী যৌথভাবে মতামত দিয়েছে।
এর জবাবে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও বলেন, কমিশনের সমস্ত যুক্তিই তিনি শুনেছেন এবং তা মানতেও প্রস্তুত। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—কোন আইনের ভিত্তিতে ৭২ ঘণ্টা ধরে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত মোটরবাইক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল? তিনি জানতে চান, এ সংক্রান্ত কোনও এসওপি বা ম্যানুয়াল থাকলে তা দেখাতে। বিচারপতি স্পষ্ট করেন, বাইক র্যালি বন্ধ করার বিষয়ে তাঁর আপত্তি নেই। তবে বর্তমান সময়ে প্রায় প্রতিটি পরিবারেই মোটরবাইক রয়েছে, সেখানে ভোটের ৭২ ঘণ্টা আগে থেকে এমন নিষেধাজ্ঞা কীভাবে আরোপ করা হল? মামলাকারী ঋতঙ্কর দাসের পক্ষে আইনজীবী সিদ্ধার্থশঙ্কর মণ্ডল ও শামিম আহমেদ আদালতে নথি পেশ করে দাবি করেন, এর আগেও তামিলনাড়ু ও গুজরাটে ভোটের আগে নির্বাচন কমিশন একই ধরনের নির্দেশ জারি করেছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে সংশ্লিষ্ট দুই হাইকোর্টই বিজ্ঞপ্তিগুলি খারিজ করে দেয়।





