দুর্ঘটনার জেরে দীর্ঘ সাড়ে চার বছর হাসপাতালের শয্যাতেই কাটাতে হয়েছিল কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাসিন্দা পুনম গুপ্তকে। কারণ, তাঁর স্বামী জয়প্রকাশ গুপ্ত স্ত্রীকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে দেখভালের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত হাই কোর্টের (Calcutta High court) হস্তক্ষেপে বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরলেন পুনম। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আইনত স্ত্রীকে অস্বীকার করার অধিকার কোনও স্বামীর নেই।
কয়েক বছর আগে স্বামীর সঙ্গে স্কুটিতে যাওয়ার সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন পুনম। স্কুটি থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর চোট পান তিনি। প্রথমে তাঁকে ভর্তি করা হয় কলাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ( Medical College and Hospital Kolkata)। পরে তাঁকে বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু চিকিৎসার পরেও তিনি কথা বলা ও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার ক্ষমতা হারান। যদিও চিকিৎসকদের দাবি, তিনি ইশারায় প্রতিক্রিয়া জানান এবং নিজে খেতে পারেন। তাই বাড়িতে রেখেও চিকিৎসা চালানো সম্ভব ।
অভিযোগ, সেই দায়িত্ব নিতে চাননি তাঁর স্বামী জয়প্রকাশ। এমনকী হাসপাতালের বিল দেওয়াও একসময় বন্ধ করে দেন তিনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসার খরচ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা। বিমা সংস্থা মাত্র ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা দেয় এবং পরিবারের তরফে জমা পড়ে মাত্র ১৫ হাজার টাকা।
এই পরিস্থিতিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থানায় অভিযোগ দায়ের করে। পরে বিষয়টি যায় ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশ্মেন্ট রেগুলেটরি কমিশনের (West Bengal Clinical Establishment Regulatory Commission) কাছে। কমিশনের নির্দেশেও কোনও সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় হাসপাতাল।
আদালতে জয়প্রকাশ দাবি করেন, তাঁর পক্ষে ‘জীবন্মৃত’ স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে দেখভাল করা সম্ভব নয়। তিনি পুনমকে সরকারি হোম বা হাসপাতালে পাঠানোর আবেদন জানান। এরপর বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের বেঞ্চ মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে। রিপোর্টে জানানো হয়, পুনমকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করা সম্ভব।
এরপর আদালত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে জানায়, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা মানসিকভাবে অসুস্থদের জন্য হোম থাকলেও অসুস্থ হলেই কাউকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। আদালতের মতে, যদি এমন প্রবণতা মেনে নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে পরিবারের সদস্য অসুস্থ হলেই তাঁকে পরিত্যাগ করার প্রবণতা বাড়বে।
আদালত আরও জানায়, পুনমের ১৭ বছরের সন্তান রয়েছে। মাকে অন্যত্র পাঠালে সন্তান মায়ের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হবে। তাই স্বামীকেই স্ত্রীর দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালের বিপুল বকেয়া বিলও মকুব করার নির্দেশ দেয় আদালত।
হাই কোর্টের নির্দেশ মেনে অবশেষে দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরলেন পুনম গুপ্ত।





