রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিধানসভার স্পিকারের কাছে জমা পড়ল তৃণমূলের ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়কের স্বাক্ষরিত চিঠি। এই চিঠিতে দলনেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নাম বজায় রাখা হলেও পরিষদীয় দলের নেতৃত্বে নতুন মুখ হিসেবে উঠে এসেছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নাম। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, বিধানসভায় প্রকৃত বা ‘আসল তৃণমূল’-এর প্রতিনিধিত্ব এখন তাঁদের হাতেই।চিঠিতে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনোনীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপ-দলনেতা হিসেবে রাখা হয়েছে সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান এবং শিউলি সাহা-কে। মুখ্য সচেতকের দায়িত্বে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে আখরুজ্জামান-কে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটকে একেবারে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। ভোটে বিপর্যয়ের পর দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার দাবি করেছিলেন যে সংগঠনের শক্তির উপর তাঁর আস্থা রয়েছে এবং দল ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিয়েছে যে দলের ভিতরে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ জমা হচ্ছিল।
বিশেষত বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়-এর নাম প্রস্তাব এবং তা ঘিরে স্বাক্ষর-বিতর্ক পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দেয়। সেই ঘটনার পরই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা সক্রিয়ভাবে বিদ্রোহী বিধায়কদের একত্রিত করার উদ্যোগ নেন।বিধানসভায় পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন সংগ্রহই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘ বৈঠক ও তৎপরতার পর অবশেষে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছে এই শিবির।
বুধবার দুপুরে স্পিকারের কাছে চিঠি জমা দেওয়ার সময় বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে যে কয়েকজন বিধায়ক এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সই না করলেও তাঁদের সমর্থন রয়েছে। তাঁরা পরে এই প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে পারেন।
তবে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বিদ্রোহী শিবিরও দলনেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামই উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। এতে একদিকে আইনি জটিলতা এড়ানো সম্ভব, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ানো যাবে।
এখন পুরো বিষয়টির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বোস-এর সিদ্ধান্তের উপর। বিধানসভায় কোন গোষ্ঠী প্রকৃত তৃণমূল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর তাঁর রায়ের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে।
সূত্রের খবর, কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে বিদ্রোহী বিধায়কদের বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। ফলে শীঘ্রই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সামনে আসতে পারে।
এদিকে এই ঘটনাকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূলের দীর্ঘদিনের নেতাদের পাশ কাটিয়ে সিপিএম থেকে আসা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার চেষ্টা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর পিছনে প্রভাবশালী শক্তির ভূমিকা রয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, দল আইনি পথে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
সব মিলিয়ে, তৃণমূলের অন্দরের এই মুষলপর্ব এখন রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। স্পিকারের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে আগামী দিনে দলের সংগঠন, নেতৃত্ব এবং বিধানসভায় তার রাজনৈতিক অবস্থান কোন পথে এগোবে।





