পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগ ও প্রশাসনিক পরিকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ, নতুন মেট্রো প্রকল্পের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে নতুন আইন আনার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।বাজেটে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার পরিকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের বিমান যোগাযোগ মূলত কলকাতা ও বাগডোগরা বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। ফলে বহু জেলার মানুষকে জরুরি প্রয়োজনে দীর্ঘ সড়ক বা রেলপথের উপর নির্ভর করতে হত। সেই পরিস্থিতি বদলাতে এবার জেলা স্তরে বিমান পরিষেবা সম্প্রসারণে জোর দিয়েছে সরকার।কেন্দ্রের ‘উড়ান’ প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পুরুলিয়া, বালুরঘাট এবং মালদহে নতুন বিমানবন্দর গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।
পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের কোচবিহার বিমানবন্দরের পরিকাঠামো ও যাত্রী পরিষেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হাসিমারা ও কলাইকুণ্ডা এলাকায় বিমান চলাচল এবং প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশেষ জমি বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।কলকাতা বিমানবন্দরের ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপ সামাল দিতে নদিয়ার কল্যাণীর কাছে একটি নতুন গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০ একর জমি চিহ্নিত করার কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুরু হবে।
সরকারের আশা, এই বিমানবন্দর চালু হলে শুধু কলকাতার চাপই কমবে না, বরং নদিয়া ও আশপাশের জেলার অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে।
শুধু আকাশপথ নয়, গণপরিবহণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণেও নজর দিয়েছে সরকার। কলকাতা মেট্রোর সাফল্যের পর এবার দুর্গাপুর, আসানসোল এবং শিলিগুড়িতে মেট্রো রেল পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত সমীক্ষা করা হবে। প্রস্তাবিত সমীক্ষার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নতুন মেট্রো করিডোর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এতে শিল্প ও বাণিজ্যনির্ভর এই শহরগুলিতে যানজট কমার পাশাপাশি দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বেআইনি হস্তক্ষেপ, সিন্ডিকেট রাজ ও চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দিতে বিশেষ আইন আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। স্বপন জানান, ‘ বেআইনি হস্তক্ষেপ এবং চাঁদাবাজির ফলে ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। এই কারণে আগামী দিনে ব্যবসাকে সিন্ডিকেট চার্জ এবং অন্য বেআইনি অর্থ আদায় থেকে রক্ষা করার জন্য একটি আইন আনা হবে।’
প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে পাঁচটি নতুন জেলা তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত জেলাগুলি হল কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর এবং আরামবাগ।
এছাড়া কাঁথিতে নতুন পুলিশ জেলা এবং গোপীবল্লভপুরে নতুন মহকুমা গঠনের কথাও বলা হয়েছে।নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। শিবমন্দির, গাজোল, চাঁচল, বেলদা, বাগনান, জয়গাঁ, কোলাঘাট, কামারপুকুর এবং টুঙ্গিদিঘিকে নতুন পুরসভা হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে।সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে বিমানবন্দর, মেট্রো, প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও ব্যবসাবান্ধব নীতির মাধ্যমে রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
আগামী দিনে এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।





