আরও একবার টাইব্রেকারই কাল হল নেদারল্যান্ডসের। ২০১৪ ও ২০২২-এর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও পেনাল্টি শুটআউটে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হল ডাচদের। গ্রুপ অব ৩২ থেকেই বিদায় নিতে হল রোনাল্ড কোম্যানের দলকে। একই দিনে জার্মানির পর বিশ্বফুটবলের আরও এক পরাশক্তির বিদায় নিশ্চিত করল মরক্কো। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ থাকার পর টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলো পেরিয়ে গেল আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।ম্যাচের নায়ক হয়ে উঠলেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো। ২০২২ বিশ্বকাপে স্পেনের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে নায়ক হওয়ার পর এ বারও একই কীর্তি গড়লেন তিনি। ডাচদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি শট আটকে দিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন। শেষ পেনাল্টিতে ইসমাইল সাইবারি নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে মরক্কোর উৎসব শুরু করেন।টাইব্রেকারে শুরুতে এগিয়ে গিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। টিউন কুপমেইনার্স প্রথম শট থেকে গোল করলেও মরক্কোর আল আয়নায়োই বল পাঠান ক্রসবারে। কিন্তু এরপরই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। জাস্টিন ক্লুইভার্টের শট পোস্টে লাগে, কুইন্টেন টিম্বারের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে মরক্কোর রহিমি ও তালবি গোল করলেও আশরাফ হাকিমি নিজের শট নষ্ট করেন। শেষ পর্যন্ত বোনো সামারভিলের শট রুখে দেন এবং সাইবারির সফল শটে জয় নিশ্চিত হয়।পরাজয়ের জন্য নেদারল্যান্ডসের রক্ষণাত্মক কৌশলকেই দায়ী করা হচ্ছে। গ্রুপ পর্বে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও নকআউটে পাঁচ ডিফেন্ডার নিয়ে মাঠে নামেন কোচ কোম্যান। ফলে মাঝমাঠে চাপ বাড়ে এবং আক্রমণে গতি হারায় দল। কোডি গাকপোকে অনেকটাই নীচে নেমে খেলতে হওয়ায় প্রথমার্ধে ডাচদের আক্রমণ কার্যত নিষ্প্রভ ছিল। ব্রায়ান ব্রবি কয়েকটি সুযোগ পেলেও মরক্কোর শক্তিশালী রক্ষণ ভাঙতে পারেননি।অন্যদিকে, শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে মরক্কো। আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজ ও ইসমাইল সাইবারির নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ তৈরি হয়। প্রথমার্ধেই গোলের সুযোগ পেয়েছিল তারা, কিন্তু নেদারল্যান্ডসের গোলরক্ষক বার্ট ভারব্রুগেন দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন।দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হন কোম্যান। উইট উইঘর্স্ট ও কুপমেইনার্স মাঠে নামার পর বদলে যায় ম্যাচের চেহারা। ৭২ মিনিটে উইঘর্স্টের হেড থেকে বল পেয়ে সামারভিল আক্রমণ গড়েন। সেই আক্রমণের শেষ পর্যায়ে কোডি গাকপো ডান পায়ের নিখুঁত শটে গোল করে নেদারল্যান্ডসকে এগিয়ে দেন।গোল করার পর গাকপোর আবেগঘন উদ্যাপন নজর কাড়ে। কয়েক দিন আগেই ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধাক্কা পেয়েছেন তিনি। সন্তানসম্ভবা বান্ধবী নোয়া ভ্যান ডার বিজের গর্ভপাতের খবর বিশ্বকাপ চলাকালীনই পান গাকপো। কঠিন মানসিক অবস্থার মধ্যেও দলের সঙ্গে থেকে বিশ্বকাপে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। গোল করার পর সেই আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি, মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সতীর্থরা তাঁকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন।মনে হচ্ছিল, সেই গোলই হয়তো নেদারল্যান্ডসকে জয়ের পথে নিয়ে যাবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দারুণ কৌশল দেখান মরক্কোর কোচ মহম্মদ উয়াহাবি। দীর্ঘদেহী সেন্টার-ব্যাক ইসা দিয়পকে স্ট্রাইকার হিসেবে তুলে এনে দুই প্রান্ত থেকে একের পর এক উঁচু ক্রস ভাসাতে শুরু করে মরক্কো। সংযুক্তি সময়ে সেই কৌশলই সফল হয়। একটি ক্রসে দুর্দান্ত হেডে সমতা ফেরান দিয়প।অতিরিক্ত সময়েও দুই দলই কিছু সুযোগ তৈরি করলেও গোল আসেনি। রহিমি একবার সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। শেষ দিকে গাকপো চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন, ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংকেও তুলে নেন কোম্যান। ফলে টাইব্রেকারে দলের দুই নির্ভরযোগ্য শ্যুটারকে পাননি ডাচ কোচ। সেই ঘাটতিরই মাশুল দিতে হয় ক্লুইভার্ট ও টিম্বারের ব্যর্থতায়।এই জয়ের মাধ্যমে আবারও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিল মরক্কো। ২০২২ বিশ্বকাপে স্পেন ও পর্তুগালকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও তারা বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখল। হাকিমি ও ব্রাহিম দিয়াজের মতো কয়েকজন পরিচিত মুখ থাকলেও দলগত সংহতি, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতাই মরক্কোকে আবারও বিশ্বমঞ্চে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।





