এসআইআর (SIR) মামলার শুনানিতে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission Of India) কাজকর্ম নিয়ে প্রকাশ্য অসন্তোষ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court Of India)। নামের বানান বিভ্রাট, মধ্যম নামকে কেন্দ্র করে নোটিস পাঠানো, এমনকি বাবা-মায়ের সঙ্গে বয়সের সামান্য ফারাক থাকলেও মানুষকে হয়রানির অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। পাশাপাশি প্রধান বিচারপতি এদিন মাইক্রো অবজার্ভারদের কাজের পরিধিও নির্দিষ্ট করে বলেন, “মাইক্রো অবজার্ভারের কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। তাদের কাজ ইআরও এবং এইআরও-কে সাহায্য করা। যদি রাজ্যের অফিসাররা যোগ দেন, তাঁরাও মতামত দিতে পারবেন। তাতে ইআরও-র সিদ্ধান্ত আরও মজবুত হবে।”এরসঙ্গে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা খতিয়ে দেখতে কমিশনকে সাত দিন সময় বেঁধে দিল শীর্ষ আদালত।
এদিন শুনানির শুরুতেই রাজ্যের বাসিন্দাদের হয়রানির বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। তিনি জানান, রাজ্য সরকার নির্বাচন কমিশনকে প্রায় ৮,৫০০ জন কর্মী দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত প্রশ্ন তোলেন, এই কর্মীদের নামের তালিকা কমিশনের কাছে আছে কি না এবং তাঁরা বাংলা জানেন কি না—কারণ আদালত আগেই বাংলা ভাষায় দক্ষ কর্মীর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল।
এ প্রসঙ্গে রাজ্যসরকারের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান জানান, জেলাভিত্তিক বিবরণ জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে কমিশনের আইনজীবী দাবি করেন, সেই তথ্য তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি। এ নিয়ে বিতর্কে যেতে না চেয়ে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করেন, নামের তালিকা সংক্রান্ত সমস্যা যদি চলতেই থাকে, তবে রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছ থেকে হলফনামা চাওয়া হতে পারে।
শুনানিতে মাইক্রো অবজার্ভারদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। প্রধান বিচারপতি জানতে চান, তাঁদের কাজ ঠিক কী। কমিশনের উত্তরের পরই প্রধান বিচারপতি জানান, ERO ও AERO দের সহায়তার জন্যই তাঁদের নিয়োগ করা হয়েছে, তাঁরা কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। রাজ্যের অফিসাররা যদি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন এবং মতামত দেন, তাহলে ইআরওদের সিদ্ধান্ত আরও শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াবে।
সোমবার রাজ্যের এসআইআর সংক্রান্ত মামলার শুনানি ছিল সুপ্রিম কোর্টে। সেই শুনানির সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, নির্বাচন কমিশনের ব্যবহৃত সফটওয়্যার অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। তাঁর পর্যবেক্ষণ, অধিকাংশ বাঙালি পরিবারে ‘কুমার’-এর মতো মধ্যম নাম থাকাই স্বাভাবিক, অথচ সেই কারণেই বহু মানুষকে নোটিস পাঠানো হচ্ছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বিস্ময়ের সুরে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে বলেন, “ধরুন শুভেন্দুনারায়ণ রায়—এখানে ‘নারায়ণ’ তাঁর মধ্যম নাম। তাঁকেও নোটিস পাঠানো হয়েছিল!” কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, “আপনারা এমন লোকেদেরও নোটিস পাঠিয়েছেন, যাঁদের ৫–৬টি সন্তান রয়েছে। ৫০ হলে ঠিক আছে। তখন নোটিস পাঠানো যেতেই পারে। কিন্তু আপনারা যে সফটঅয়্যার টুল ব্যবহার করছেন, তা অত্যন্ত কঠোর।” এর পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দিওয়ান বলেন, “নামের বানান গরমিলের ক্ষেত্রে ডিফল্ট অবস্থান হওয়া উচিত। এই ভোটারদের বাদ দেওয়া যাবে না। কমিশনকে এমন নির্দেশ দিন।” তবে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, “এই মুহূর্তে আমরা এমন কোনও নির্দেশ দিতে পারি না।” এরপরই দিওয়ান আরও বলেন, “১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে। তারপর আর আপিল করার সুযোগ থাকবে না। একবার ফাইনাল রোল (চূড়ান্ত ভোটার তালিকা) হলে, তার পরেই নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি হবে। আমাদের একটাই উদ্বেগ— গণহারে যেন ভোটারদের বাদ না দেওয়া হয়।”
সব মিলিয়ে, এদিনের শুনানিতে এসআইআর সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থার অভাব নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দিকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিল শীর্ষ আদালত।





