আজ, সোমবার থেকে রাজ্যে কার্যকর হল ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৬’, যা সাধারণভাবে ‘গুন্ডাদমন আইন’ নামে পরিচিত। এই আইনের মাধ্যমে রাজ্য সরকার, পুলিশ কমিশনার, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা সরকার মনোনীত ডিআইজি পদমর্যাদার কোনও আধিকারিক সমাজবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আটক করার নির্দেশ দিতে পারবেন। প্রয়োজনে কোনও নিয়মিত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই একজনকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত আটক রাখা সম্ভব হবে। যদিও আটক ব্যক্তি সরকারের নির্ধারিত পর্যালোচনা কমিটি বা কমিশনের কাছে আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
এই প্রসঙ্গে সোমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) দাবি করেন, “১৫ বছর রাজ্যে তৃণমূলী গুন্ডাদের সরকার ছিল, তার আগে ৩৪ বছর কমিউনিস্ট হার্মাদদের সরকার ছিল- এদের জব্দ করার জন্য এই আইনের খুব প্রয়োজন ছিল।বিধানসভায় আইন পাস করিয়েছি, আইন কার্যকর হয়েছে।”
গত ২৯ জুন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ‘পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’(West Bengal Public Safety and Control of Anti-Social Activities Bill 2026) পাশ হয়। এই আইনে কমিশনকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনও ঘটনার ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত অঙ্কের চেয়েও সর্বোচ্চ দ্বিগুণ পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা ধার্য করা যায়।
আইনে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের পরিধিও অনেক বিস্তৃত করা হয়েছে। এমন যে কোনও কাজ, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে, তা এই আইনের আওতায় আসবে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ, মানুষের জীবন বা সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি, বৈধ ব্যবসা বা পেশায় বাধা সৃষ্টি, বেআইনিভাবে জমি বা সম্পত্তি দখল, সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা, অবৈধভাবে বালি, পাথর বা খনিজ সম্পদ উত্তোলন, বন ও বন্যপ্রাণের ক্ষতি এবং সিন্ডিকেট বা তোলাবাজির মতো সংগঠিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।
আইনে ‘গুন্ডা’ শব্দটিরও নির্দিষ্ট সংজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। কোনও ব্যক্তি যদি নিজে বা কোনও গ্যাং, সিন্ডিকেট কিংবা সংঘবদ্ধ দলের সদস্য বা নেতা হিসেবে নিয়মিত সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তবে তাঁকে এই আইনের আওতায় ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে। এছাড়া অস্ত্র আইন, মাদক আইন, বিস্ফোরক আইন, অনৈতিক পাচার প্রতিরোধ আইন কিংবা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার নির্দিষ্ট গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তি বা এ ধরনের অপরাধের পরিকল্পনা বা প্রচেষ্টার অভিযোগ থাকলেও এই আইন প্রযোজ্য হতে পারে।
ফলে শুধুমাত্র অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর নয়, সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যেও প্রশাসন আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পাবে।
রাজ্য সরকারের দাবি, সংগঠিত অপরাধ, তোলাবাজি, বেআইনি দখলদারি, সিন্ডিকেট রাজ এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, আইনটির বিস্তৃত ক্ষমতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধিতা বা সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। সেই কারণেই বিরোধীরা একে ‘কালা কানুন’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। ফলে আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা রাজনৈতিক ও আইনি মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইতিমধ্যেই এই আইনের উপর অবিলম্বে স্থগিতাদেশ চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের (Calcutta HC) দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল। সিপিএম নেতা তথা আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়ের আবেদন মেনে জনস্বার্থ মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চে। চলতি সপ্তাহে শুনানি হতে পারে।




