একসময় বাংলার ভোটের প্রচারমঞ্চ কাঁপত ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ তত্ত্বে। বিজেপিকে কোণঠাসা করতে পূর্বতন শাসকদল বারবার দাবি তুলেছিল, গেরুয়া শিবির ক্ষমতায় এলে নাকি বাঙালির পাতে টান পড়বে মাছ-মাংসে। প্রচারসভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি সেই আশঙ্কার কথা শোনাতেন জনতাকে। শুধু বক্তব্যেই থেমে থাকেনি প্রচার। কোথাও মাছ হাতে মিছিল, কোথাও ইলিশ বা চিংড়িকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বার্তা— গোটা নির্বাচনী আবহেই খাদ্যাভ্যাস হয়ে উঠেছিল প্রচারের বড় অস্ত্র। কিন্তু রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতেই বদলে গিয়েছে রাজনৈতিক বার্তার ভাষাও। এখন বাংলার সংস্কৃতি, রীতি, খাদ্যাভ্যাস— সবকিছুর সঙ্গেই নিজেদের আরও গভীরভাবে জুড়ে নিতে মরিয়া বিজেপি। আর সেই প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে বাঙালির চিরন্তন মাছ-ভাত।বুধবার নবনিযুক্ত বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মেনুও সেজে উঠেছিল মাছ-ভাতে।
নবান্নে প্রশাসনিক পালাবদলের পর থেকেই সরকারি অনুষ্ঠানগুলিতে বাঙালি খাবারের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। তারই সর্বশেষ নজির বিধানসভার শপথ অনুষ্ঠান। রাজনৈতিক মহলের চর্চা, ওই অনুষ্ঠানের আপ্যায়ন পর্বেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে মাছের নানা পদ। অর্থাৎ, বাংলার সংস্কৃতিকে অস্বীকার নয়, বরং তাকে আপন করেই এগোতে চাইছে নতুন শাসকদল— এমন বার্তাই দিতে চাইছে বিজেপি নেতৃত্ব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলায় দীর্ঘমেয়াদি জমি শক্ত করতে গেলে শুধুমাত্র মতাদর্শ নয়, বাঙালির জীবনযাপন ও আবেগকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে— এই বাস্তবতা এখন স্পষ্টভাবে বুঝে গিয়েছে গেরুয়া শিবির।
বুধবার রাজ্য রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। বিধানসভায় শপথ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-সহ মোট ১৫২ জন নবনির্বাচিত বিধায়ক। শাসকদলের পাশাপাশি বিরোধী শিবিরের প্রতিনিধিরাও এদিন শপথগ্রহণে অংশ নেন। তৃণমূলের তরফে শপথ নেন মদন মিত্র, নিয়ামত শেখ -সহ আরও কয়েকজন বিধায়ক। নজর কাড়েন রেজিনগর ও নওদা কেন্দ্র থেকে জয়ী আমজনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবির-ও।
বিধানসভার অধিবেশন শুরু হতেই নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়। একে একে সদস্যরা সাংবিধানিক শপথ গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক সৌজন্য ও আনুষ্ঠানিকতার আবহে এদিনের অধিবেশন ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে শুধু শপথপর্ব নয়, মধ্যাহ্নভোজ নিয়েও এদিন ছিল আলাদা কৌতূহল। শপথবাক্য পাঠ শেষ হওয়ার পর দুপুরের খাবারের কথাও ঘোষণা করেন প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়। এদিন বিধানসভার কক্ষে তিনি জানান, ‘আজ সব সদস্যের জন্য লাঞ্চের ব্যবস্থায় রয়েছে মাছ ভাত।’
সূত্রের খবর, প্রোটেম স্পিকার তাপস রায় দুপুরের খাবারের ঘোষণা করতেই শাসকদলের অন্দরে যেন খানিক আলাদা উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-সহ বিজেপি বিধায়কদের মুখে তখন ছিল চওড়া হাসি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বাংলার আবেগ ও খাদ্যসংস্কৃতিকে সামনে রেখেই নতুন সরকার নিজেদের বার্তা আরও স্পষ্ট করতে চাইছে।
প্রসঙ্গত, সোমবার নবান্নে নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকেও আপ্যায়নে ছিল বাঙালির চিরচেনা স্বাদ। সন্ধ্যার স্ন্যাকসে রাখা হয়েছিল ফিশফ্রাইয়ের ব্যবস্থা।





