রাজ্যে পালাবদলের পরই তৃণমূলের অন্দরেও চলছে জোর পালাবদল। আসল আর নকলের চক্করে জেরবার রাজ্যের পূর্বতন শাসকগোষ্ঠী। এই আবহে সোমবার জল্পনা সত্যি করে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে চিঠি জমা দেন তৃণমূলের কুড়ি ‘বিদ্রোহী’ সাংসদ। তাঁরা নাকি সকলেই এনডিএ-র শরিক হতে চেয়েছেন। সেই দলে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম আস্থাভাজন তারকামুখ তথা ঘাটালের সাংসদ দীপক অধিকারী (দেব) (Dev)। গতকাল দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পরই গত চব্বিশ ঘণ্টায় রাজ্য-রাজনীতি একপ্রশ্নেই তোলপাড়, দেব কি তবে এনডিএ জোটের শরীক হচ্ছেন বা বকলমে বিজেপিতে শামিল হচ্ছেন? এরপরই মঙ্গলবার কোলঘাটে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে দেবের উপস্থিতি সেই জল্পনাকেই আরও জোরাল করেছে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসাও করলেন। পাশাপাশি দরাজ কন্ঠে জানিয়ে দিলেন, “নতুন তৃণমূলে যাচ্ছি না, আমি মমতাদির পাশেই থাকব।”
সোমবার দিল্লির দরবারে বেনজির পটপরিবর্তনে স্বাভাবিকভাবেই ওয়াকিবহালমহল রূপালি পর্দার পাশাপাশি রাজ্য-রাজনীতিতেও নতুন ‘দেশু সমীকরণে’র আভাস পেয়েছিল। দেব-শুভেন্দু সমীকরণ নিয়ে কৌতূহলের অন্ত নেই! তাহলে কি স্বরূপ-সংঘাতে তৃণমূলে মন বিষিয়ে ছিল দেবের? সেজন্যেই এবার দিল্লিতে উড়ে গিয়ে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে রূদ্ধদ্বার বৈঠক করলেন? মঙ্গলবার কোলাঘাটের প্রশাসনিক বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে যাবতীয় প্রশ্নের জবাব দিলেন তৃণমূলের সুপারস্টার সাংসদ। তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন শুনেই দেবের স্পষ্ট জবাব, “আমার ভালোবাসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সারাজীবন থাকবে। আমি নতুন তৃণমূলে যাচ্ছি না। যতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে রয়েছেন, ততদিন আমি ওঁর সঙ্গে রয়েছি।”
সেই সঙ্গে দলের টালমাটাল পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সাফ কথা, ” ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা নিয়ে আমি এখনই কিছু বলতে চাইছি না। দিদির সঙ্গে এরমধ্যেও কথা হয়েছে আমার। তবে দিল্লিতে যাওয়া বা আজকের প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেওয়া নিয়ে যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তবে একটাই কথা বলব যে, আজও আমি তৃণমূল সাংসদ কিংবা ঘাটালের জনপ্রতিনিধি হিসেবেই এখানেই এসেছি। কারণ সেখানকার মানুষেরা আমাকে একটা বিশ্বাস নিয়ে ভোট দিয়েছেন যে, এই মানুষটি ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের স্বপ্ন পূরণ করবেন। সেই স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যেই আমি আজ শুভেন্দুদার কাছে এসেছি।”
এমনকি ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত করতে শুভেন্দু সরকার সহযোগিতা করবে বলেও আশাবাদী দেব। করেন। তিনি বলেন,” আইন, প্রশাসনিক পদকে তো সম্মান করতেই হবে, এই বিষয়টা সকলের মাথায় রাখা উচিত। শুভেন্দু অধিকারী যে আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সেটা তো মানতেই হবে। আমার কাজ হচ্ছে, এই ডাবল ইঞ্জিন সরকারের হাত ধরে যে প্রতিশ্রুতিগুলি আমি আমার কেন্দ্রের মানুষকে দিয়েছি, সেটা পূরণ করা। কারণ একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে সেই দায়িত্বপূরণের দায়ভার সম্পূর্ণ আমার। আমার পূর্ণবিশ্বাস রয়েছে যে, ২০২৯ সালের মধ্যে শুভেন্দুদা বা কেন্দ্রীয় সরকার ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটা শেষ করবেন।” তাহলে দলের বাকি বিদ্রোহী সাংসদদের সঙ্গে দেব দিল্লিতে কেন? প্রশ্ন অমূলক নয়!
পাশাপাশি তিনি বলেন, “২০১৪ সাল থেকে আমি সৌজন্যের রাজনীতি করে আসছি। আজকে অনেকেই হয়তো বলতে পারেন যে, দেব পালটে গিয়েছে! কিন্তু দেব পালটায়নি। কারণ দেব সবসময়ে মানুষকে একসূত্রে বাঁধার রাজনীতি করেছে। এবং আমি সবসময়ে মানুষকে ভালোবাসা দেওয়ার রাজনীতির করেছি। যে যে-ই দলেরই সমর্থক হোক না কেন, আমি সকলকেই সমানভাবে সম্মান দিয়েছি। এবং আজ অবধি রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে কোনওদিন বিরোধীদের উদ্দেশে কোনও অপশব্দ প্রয়োগ করিনি। আমি শুরু থেকে যেরকম সৌজন্য, ভালোবাসার রাজনীতি করে এসেছি, আজও সেটাই করছি। এটা নতুন কিছু তো নয়! আমাকে ঘিরে যেবার ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, আমি তো সেসময়েও তাদের গলায় জড়িয়ে ধরেছি। বা ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল অবধি এমন কোনও কাজ করিনি যাতে আমার দলের নাম খারাপ হবে। বা এরকমও নয় যে যাঁরা আমাকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি বানিয়েছেন, তাদেরও মনে হচ্ছে যে- ভুল লোককে ভোট দিয়েছি! গোড়া থেকেই তাদের জন্য লড়াই করছিলাম, আজও তাদের মুখ চেয়েই প্রশাসনিক বৈঠকে এসেছি। আজকের মিটিংয়ে শুভেন্দুদদা বললেন, নতুন বাজেটে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য বাজেট বরাদ্দ হবে।”
তৃণমূলের ‘তারকা সাংসদে’র সাফ কথা, “সাংসদের থেকেও বড় কথা আমি ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের জনপ্রতিনিধি। ২০১৪ সাল থেকে ঘাটালের সবথেকে বড় যন্ত্রণা বন্যার সাক্ষী আমি। যার সমাধান ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। সেই লড়াইটা আমার ২০১৪ সাল থেকে চলছিল। শেষমেশ ২০২৪ সালে দিদি সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করে কাজ শুরু করেন। সেসময়ে আড়াইশো কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু এবারের জনাদেশে যেহেতু দৃশ্যটা আলাদা, রাজ্যে নতুন মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন, সেইজন্যই আমি ঘাটালের জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কথা বলেছি। উনি সকলের সামনেই জানিয়েছেন, এই সরকার ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে, যেটা শুরু হয়েছিল পূর্বতন সরকারের হাত ধরে।”
তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ শিবিরকে নিয়ে অভিনেতা সাংসদ জানালেন, “দলের বাকিরা কে কী বলছেন, সকলের সঙ্গে আমার উত্তর তো এক হতে পারে না। কারণ আমি কোনওদিনও এটা দাবি করতে পারব না যে, মমতাদি আমার কথা শোনেননি। আমাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিমাফিক উনিই ২০২৪ সালে সেই প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৫৮ সালে মান সিং কমিটি যে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের প্রস্তাব দিয়েছিল, সেটা তো মমতাদির হাত ধরেই শুরু হয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যিনি আমার কথা শুনলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আমি কেন বিরূপ মন্তব্য করব? জুনদি বা অন্যান্যরা যা বলছেন, সেই সুরে আমি কথা বলতে পারব না। আমি দিদিকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, চাই উনি সুস্থ থাকুন। আমার শুধু এটুকুই ইচ্ছে যে, ঘাটালের মানুষদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি যেন আমি পূরণ করতে পারি। যতদিন না ২০২৯ সাল আসছে, ততদিন সেই লড়াইটা তো আমাকে চালিয়ে যেতেই হবে। আর সেটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা নতুন প্রশাসনের হাত ধরেই করতে হবে। একটা কথাও তো আমি বেসুরো বলছি না।”
উল্লেখ্য, মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেই শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলা উন্নয়নের লক্ষ্যে এগোবে। মঙ্গলবার দেবের মন্তব্যেও সেটা স্পষ্ট যে, কোনওরকম দলবদলের অভিসন্ধি নিয়ে নয়, বরং ফি বছর বন্যাকবলিত ঘাটালের মানুষদের দুঃখ-দুর্দশা মেটাতেই শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।





