ভোটের পর থেকেই একের পর এক প্রশাসনিক চাপের মুখে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। এবার তৃণমূল সাংসদের কলকাতার দুই গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা—কালীঘাট রোড এবং হরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ি শান্তিনিকেতন সহ মোট ১৭ টি সম্পত্তিতে নোটিশ পাঠাল কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal corporation)। সূত্রের খবর, সংশ্লিষ্ট বাড়িগুলিতে অতিরিক্ত নির্মাণ বা পরিবর্তনের কাজ হয়ে থাকলে তার জন্য পুরসভার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তার সমস্ত নথি দেখতে চায় পুরসভা। তাঁর দুটি ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হয়েছে। প্রথম নোটিশটি পাঠানো হয়েছে অভিষেকের মা লতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। আর দ্বিতীয় নোটিশটি লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের নামে গিয়েছে, যার পরিচিতি অভিষেকের সংস্থা হিসাবেই।
ওই জোড়া নোটিসে দু’টি ঠিকানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে— ভবানীপুর বিধানসভার ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের ১২১, কালীঘাট রোড এবং ১৮৮এ হরিশ মুখার্জি রোড। নোটিসে বলা হয়েছে, ওই দুই ঠিকানায় যে নির্মাণ রয়েছে তাতে প্ল্যান-বহির্ভূত কিছু অংশ তৈরি করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে ওই অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলতে হবে। যদি ওই অবৈধ অংশ সম্পত্তির মালিক না-ভাঙেন, তবে তা পুরসভা কেন ভেঙে দেবে না, তার কারণ দর্শাতে হবে। পুরসভা সূত্রে খবর, নির্মাণ সংক্রান্ত নথি, অনুমোদনের কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনার তথ্য পুরসভার বিল্ডিং বিভাগে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব না মিললে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।এরপর থেকে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তাহলে কি এবার বুলডোজার চলবে অভিষেকের শান্তিনিকেতনে!
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর রাজনৈতিক বার্তা। কয়েকদিন আগেই ডায়মন্ড হারবারের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি হুঁশিয়ারির সুরে বলেছিলেন, “সব কিছুর হিসেব হবে।” তারপরেই অভিষেকের বাড়ি নিয়ে পুরসভার নোটিশ ঘিরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে।
সোমবার সন্ধ্যায় ক্যামাক স্ট্রিটে আয়োজিত ধন্যবাদ জ্ঞাপন অনুষ্ঠানেও অভিষেককে নিশানা করেন শুভেন্দু। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের “২৪টি সম্পত্তির” তথ্য প্রশাসনের নজরে রয়েছে। যদিও এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে এখনও প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক।

শুভেন্দুর এই বার্তার পরই নড়েচড়ে বসল কলকাতা কর্পোরেশন। হরিশ মুখার্জি রোড এবং কালীঘাট রোডের সম্পত্তি নিয়ে টানা তিনদিন ধরে অ্যাসেসমেন্টের কাজ চালানোর পর অবশেষে ৪০১ ধারায় নোটিশ পাঠানো হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের কাছে। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, কালীঘাট রোডের বাড়িটি ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’-এর সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে। সেই বাড়ি-সহ হরিশ মুখার্জি রোডের সম্পত্তি নিয়েও খতিয়ে দেখা হচ্ছে নির্মাণ সংক্রান্ত নথি। মূলত জানতে চাওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বাড়িগুলি পুরসভার অনুমোদিত নকশা মেনেই তৈরি হয়েছে কি না। পাশাপাশি, পরে কোনও অতিরিক্ত নির্মাণ বা পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে তার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই তথ্যও জমা দিতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনিক স্তরে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এর মাধ্যমে কি তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্যতালাশ শুরু হল? কারণ, ছাব্বিশের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস-এর পরাজয় এবং রাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই বিরোধী নেতাদের ঘিরে প্রশাসনিক সক্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি ‘শান্তিনিকেতন’-এর সামনে থেকে পুলিশি নিরাপত্তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রিত থাকা ওই রাস্তা সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আর সেই ঘটনার পর এবার পুরসভার নোটিস নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা আরও উসকে দিল বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের।





