পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের ফাটল ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সই জালিয়াতি বিতর্কে দুই বিধায়ককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Bnaerjee) বলেন, “এরা যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সেজন্য ক্ষমা করিনি।” এই বহিষ্কারের পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে একাধিক জল্পনা মাথাচাড়া দিয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, তৃণমূলের আরও বহু বিধায়ক দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন। এমনকি প্রায় ৫০ জন বিধায়ক দল ছাড়তে পারেন বলেও গুঞ্জন ছড়িয়েছে। সেই জল্পনা সত্যি হলে বিধানসভায় তৃণমূলের অবস্থান বড়সড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
এদিকে বহিষ্কৃত দুই বিধায়ককে ঘিরে ‘নতুন তৃণমূল’ গঠনের সম্ভাবনা নিয়েও নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই, তবু রাজনৈতিক অন্দরে গুঞ্জন থামছে না।
মহারাষ্ট্রের রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসও এই আলোচনায় উঠে আসছে। সেখানে দলীয় ভাঙনের জেরে শরদ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন এনসিপি এবং উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা বড় ধাক্কা খেয়েছিল। দলের নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনাও টানা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
বহিষ্কারের পর থেকেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে দলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তৃণমূলের অভ্যন্তরে দুর্নীতি সম্পর্কে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে এবং প্রয়োজনে তিনি সেই বিষয়ে সরকারের কাছে লিখিত অভিযোগও জানাতে পারেন। তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
অন্যদিকে, তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন একটি ফেসবুক লাইভে নাম না করে বিদ্রোহী নেতাদের কড়া বার্তা দেন। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী শিবির বিশেষ করে বিজেপি রাজ্যে দল ভাঙানোর চেষ্টা করছে। এদিন মমতা বলেন, “আমি বড় খেলোয়ার।” নাম না করে ঋতব্রতকে আক্রমণ করে বলেন, “সিপিএম করত। আমাদের ভুল হয়েছে তাঁকে টিকিট দেওয়া। পায়ে এসে পড়েছিল। সেদিন সিপিএম ঠিক করেছিল। অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে আমি তাঁদের প্রশংসা করি। তা সত্ত্বেও আমরা তাঁকে দু’বার সাংসদ করেছি। অন্য লোকের টিকিট কেটে তাঁকে হাওড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। এরা যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সেজন্য ক্ষমা করিনি।”
তৃণমূল নেত্রী আরও বলেন, “যারা রোজ গিয়ে বিজেপিতে মিট করছে। বিজেপির কথামতো সবাইকে ডেকে ভয় দেখাচ্ছে। এর মধ্যে একজন সাংসদও আছেন। তিনি আবার অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। অপরাধটা কী? তিনি তাঁর ছেলের জন্য টিকিট চেয়েছিলেন। সবার কী কেবল বাবা-মা এমপি হবে, তাঁর ছেলেমেয়েরাই টিকিট পাবে? সেটা তো হতে পারে না। আমি একজন এমএলএ ছিলাম। অভিষেক একজন এমপি ছিল। এত বড় পরিবার। প্রায় ৫০ জন আমাদের পরিবারে লোক। আর এক-একটা পরিবারে তো চার ভাই তো চার ভাই-ই এমএলএ-এমপি হয়েছেন। সেগুলোর কৈফিয়ত কে দেবে? দল সব সিদ্ধান্ত নেবে।” সেই কথা আরও একবার জানালেন নেত্রী। এদিন মানুষের কাছে ‘বিশ্বাসঘাতক’দের টিকিট দেওয়ার জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন মমতা।
ফলে তৃণমূলের অন্দরের এই টানাপোড়েন আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর এখন রাজ্য রাজনীতির।




