বাংলার বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে অনুপ্রবেশ ও জনবিন্যাস পরিবর্তনের ইস্যুকে জোরালভাবে তুলে ধরলেন নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। আগেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এবার ঐতিহাসিক ব্রিগেডের জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী একই ইস্যুতে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন। প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিতভাবে জনসংখ্যার গঠন বদলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাঙালি হিন্দুরা ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। তাঁর দাবি, হিন্দুরা কখনও বিভাজনের রাজনীতি সমর্থন করেনি, অথচ তৃণমূল সরকার শরণার্থী হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করছে। মোদির বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলার “রুটি, বেটি ও মাটি” আজ অনুপ্রবেশকারীদের কারণে হুমকির মুখে। তাঁর দাবি, এই পরিস্থিতির ফলে অনেক বাঙালি নিজেদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
শনিবার ব্রিগেডের ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে বাংলায় ভাষণ শুরু করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তৃণমূল সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ব্রিগেডে মানুষের বিপুল সমাগম দেখে বোঝা যাচ্ছে যে বাংলার মানুষ পরিবর্তন চাইছেন। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নানা বাধা সৃষ্টি করছে। সমর্থকদের সভায় আসা আটকাতে গাড়ি থামানো, সেতু বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। কিন্তু এসবের পরেও মানুষকে দমিয়ে রাখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর কথায়, “রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে।“
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে রাজ্যে বিজেপির সরকার না থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের পাশে রয়েছে। তিনি জানান, এদিন প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মোদির দাবি, একসময় শিল্প ও বাণিজ্যে এগিয়ে থাকা বাংলায় আজ তরুণদের কাজের জন্য অন্য রাজ্যে যেতে হচ্ছে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও তৃণমূল সরকার রাজ্যে ক্ষমতায় থেকেও উন্নয়ন করতে পারেনি। বিজেপি ক্ষমতায় এলে যুবকদের জন্য রাজ্যেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে মোদি বলেন, নিয়োগ দুর্নীতি ও কাটমানির কারণে সাধারণ মানুষ নানা প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না। কেন্দ্রীয় প্রকল্প যেমন পিএম আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন বা আয়ুষ্মান ভারত ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। কৃষকদের অবস্থার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। আলুচাষিদের সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দুর্নীতি ও ভুল নীতির কারণে কৃষক থেকে মধ্যবিত্ত—সবাই সমস্যায় পড়ছেন।
মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে অপরাধ বাড়ছে এবং সরকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বিজেপি সরকার এলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বদলে যাবে এবং মহিলারা নিরাপদ বোধ করবেন বলে তিনি দাবি করেন।
এছাড়া অনুপ্রবেশ, ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগও তোলেন মোদি। তিনি বলেন, এসব কারণে বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে মোদি বলেন, রাজ্যের সরকার অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। বরং তাদের ভোটার তালিকায় রেখে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, তৃণমূলের রাজনীতি মূলত অনুপ্রবেশকারীদের ভোটব্যাঙ্ককে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। সিএএ নিয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থানেরও তীব্র সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কেন্দ্র যখন শরণার্থী হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য আইন তৈরি করল, তখন তৃণমূল সরকার তার বিরোধিতা করে। এর মাধ্যমে তারা আসলে হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ রোধ করতে চাইছে।
ভাষণের শেষে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা উদ্ধৃত করে মোদি বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু সরকার বদলের নয়, বাংলার ভবিষ্যৎ ও আত্মাকে রক্ষা করার লড়াই। মানুষের ইচ্ছাশক্তি থাকলে পরিবর্তন কেউ আটকাতে পারবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।





