ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর থেকেই দলের অন্দরে শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনার ঝড়। একের পর এক নেতা, সাংসদ ও পুরপ্রতিনিধিরা দলীয় পদ ছেড়ে দিচ্ছেন।কাকলি ঘোষদস্তিদার, সুশান্ত ঘোষ, অরূপ চক্রবর্তী- ক্রমেই হেভিওয়েটদের তালিকাটা দীর্ঘ হচ্ছে। সেই তালিকায় এবার নাম জুড়ল বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা তথা চিকিৎসক ডাঃ শান্তনু সেনের (Dr. Shantanu Sen)।বৃহস্পতিবার তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্রের পদ থেকে ইস্তফা দেন। এক ভিডিওবার্তায় সেই কথা নিজেই জানিয়েছেন শান্তনু।
পাশাপাশি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) লেখা চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের হয়ে মুখপাত্র হিসেবে আর কাজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।ইস্তফাপত্রে শান্তনু সেন লেখেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলার মানুষ যখন আর জি কর কাণ্ড, অভয়া কাণ্ড, চাকরি বিক্রি-সহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজ ও দুর্নীতির জন্য আমাদের প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই অবস্থায় আমার মন আর কোনওভাবেই মুখপাত্র হিসেবে এগুলোকে সমর্থন করার সম্মতি দিচ্ছে না।’
এর আগেও আর জি কর ইস্যুতে দলের অবস্থানের বিরোধিতা করায় শান্তনু সেনকে সাসপেন্ড করেছিল তৃণমূল। পরে অবশ্য সেই সাসপেনশন তুলে নিয়ে তাঁকে ফের জাতীয় মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সম্প্রতি রাজ্যে সরকার বদলের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উদ্যোগে নতুন করে খোলা হয়েছে আর জি কর মামলার ফাইল। সেই পদক্ষেপকে স্বাগত জানান শান্তনু সেন। বুধবার সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি আর জি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ডাঃ সন্দীপ ঘোষ ও চিকিৎসক-বিধায়ক সুদীপ্ত রায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তোলেন।
তিনি আরও বলেন, মুখ্যমন্ত্রী চাইলে তদন্তে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত তিনি। এতদিন মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নীরব ছিলেন বলেও জানান শান্তনু। এখন তাঁর মেয়ে চিকিৎসক হওয়ায় আর কোনও বাধা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।শুধু তাই নয়, রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বহুল আলোচিত ‘উত্তরবঙ্গ লবি’ নিয়েও সরব হন তিনি।
তাঁর এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছিল যে, তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ছে। বৃহস্পতিবারের ইস্তফা সেই জল্পনাকেই আরও উস্কে দিল।ভিডিও বার্তায় নিজেকে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘অনুগত সৈনিক’ বলে উল্লেখ করে শান্তনু সেন জানান, “তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে ছিলাম। দল আমাকে যখন যা দায়িত্ব দিয়েছে সেগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করেছি।দল আমাকে জাতীয় মুখপাত্র করেছিল। এমন বহু ঘটনা যে ঘটনাকে মন সায় দেয় না, সাধারন মানুষ সমর্থন করতে দেয় না- তা জেনেও শুধু দলের মুখপাত্র হিসাবে, দলের হয়ে সংবাদমাধ্যমে লড়াই করেছি । তার জন্য সাধারন মানুষ আমাকে অনেক কথা শুনিয়েছেন, আমাকে সেগুলো হজম করতে হয়েছে। কিন্তু রাজনীতিটা তো আসলে মানুষের জন্যই। সেই বাংলার মানুষ ২০২৬ এর ৪মে বিপুল ম্যান্ডেটের মধ্যে দিয়ে যখন বুঝিয়ে দিলেন চাকরি চুরি, আরজিকর-অভয়া কাণ্ড সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে, তখন সেই মানুষের রায়কে মাথা পেতে নিয়ে হার স্বীকার করা উচিত। সেই রায় মাথা পেতে নিয়ে আমার মন আর কোনও ভাবে সম্মতি দিচ্ছে না এই ধরণের দুর্নীতিকে সমর্থন করতে হবে।” এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জাতীয় মুখপাত্রের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে ইস্তফাপত্র পাঠিয়েছেন শান্তনু।

অন্যদিকে, বুধবার পুরসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার দলীয় মুখপাত্রের দায়িত্বও ছেড়ে দেন তৃণমূল কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তী। ফলে তৃণমূলের অন্দরে ভাঙনের জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।






