কনকনে শীতের মতোই এবার গ্রীষ্মেও চরম পরিস্থিতির আশঙ্কা করছে হাওয়া অফিস। পশ্চিমের পাথুরে জেলা পুরুলিয়ায় এবার গরমে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। সেই আশঙ্কাকে সামনে রেখেই আগাম প্রস্তুতিতে নেমে পড়েছে পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন। কাঠফাটা দাবদাহে যাতে কোথাও পানীয় জলের হাহাকার না তৈরি হয়, তার জন্য রূপায়িত হচ্ছে বিশেষ ‘সামার ওয়াটার সাপ্লাই প্ল্যান’।
জেলা প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, যেসব ব্লক ও শহরাঞ্চলে পানীয় জলের সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়, সেগুলিকে চিহ্নিত করে আলাদা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোথায় অকেজো নলকূপ রয়েছে, কোন এলাকায় নতুন টিউবওয়েল বসানো জরুরি, আবার কোন জায়গায় ট্যাঙ্কারে জল সরবরাহ ছাড়া বিকল্প নেই—এই সব তথ্য খতিয়ে দেখে বিস্তারিত তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন জেলাশাসক।
এই কাজে ব্লকে ব্লকে বিডিওদের পাশাপাশি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং ওসি-আইসিদের যুক্ত করা হয়েছে। শহরাঞ্চলেও পুরপ্রধান, প্রশাসক ও মহকুমাশাসকদের তত্ত্বাবধানে একই ধরনের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরও আলাদাভাবে সমীক্ষা চালাচ্ছে। দুই পক্ষের রিপোর্ট মিলিয়ে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে খুব শীঘ্রই ‘সামার ওয়াটার সাপ্লাই প্ল্যান’ চূড়ান্ত করতে বৈঠক ডাকবেন জেলাশাসক। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সেই বৈঠক হতে পারে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর।

প্রসঙ্গত, ঝাড়খণ্ড সংলগ্ন এই পাথুরে জেলায় গ্রীষ্ম এলেই হু হু করে নেমে যায় ভূগর্ভস্থ জলস্তর। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয় পুরুলিয়া শহর, বাঘমুন্ডি ব্লকের অযোধ্যা পাহাড় ও পাহাড়তলি এলাকায়। জলকষ্টের ছবি দেখা যায় ঝালদা, শিল্পনগরী রঘুনাথপুর, জয়পুর, ঝালদা-২, আড়শা, খনি অঞ্চল নিতুড়িয়া, বান্দোয়ান এবং মানবাজার-২ ব্লকেও। অতীতে এই জলসংকট থেকে পাড়ায় পাড়ায় অবরোধ, এমনকি জাতীয় সড়ক অবরোধের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে আইন-শৃঙ্খলায়।
এই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই বিধানসভা নির্বাচনের আগে কোনও রকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়াতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পুরুলিয়া পুরসভা। জেলাশাসকের নির্দেশ পাওয়ার পর পুরুলিয়া পুরসভা মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ শুরু করেছে। খুব শীঘ্রই সেই মাস্টার প্ল্যান জেলাশাসকের কাছে জমা দেওয়া হবে।
এই মাস্টার প্ল্যানে শহরের মাটির নীচের জল পরিকাঠামোর ম্যাপিং করা হচ্ছে—কোথায় কোন ভাল্ভ রয়েছে, পাইপলাইনের অবস্থা কেমন, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। কারণ ভাল্ভ ও পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে বিপুল পরিমাণ জল অপচয় হয়। এছাড়া শহরজুড়ে প্রায় ৪০০-৫০০টি স্ট্যান্ড পোস্ট রয়েছে, যেখানে কলের মাথা নেই। সেখান থেকেও অবিরাম জল নষ্ট হচ্ছে। সেই স্ট্যান্ড পোস্টগুলি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুরসভা। পাশাপাশি শহরের পুরনো জলাধার বা জলের উৎস, যেগুলি বর্তমানে বুজে গেছে, সেগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

গ্রামীণ এলাকাতেও জেলার সমস্ত জলস্তর ও ওয়াটার লিফটিং স্টেশনগুলির বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক এবং কার্যকরী দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিডিও ও মহকুমাশাসকদের পানীয় জল পরিস্থিতি নিয়ে হাই অ্যালার্টে রেখে নিয়মিত স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জেলার সমস্ত টিউবওয়েল ও নলকূপ দ্রুত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করে সচল রাখতে হবে। বন্ধ পাম্প মোটর ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন দ্রুত সারানোর কথাও বলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ভবিষ্যতের কথা ভেবে বৃষ্টির জল সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নিচ্ছে পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন। লক্ষ্য একটাই—চরম গ্রীষ্মেও যেন পুরুলিয়ার মানুষ পানীয় জলের অভাবে না ভোগেন।





