আরজিকর (RGKar incident) হাসপাতালে লিফট কাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য তদন্তকারী অফিসারদের হাতে এল। বেসমেন্টের চাবি যে হাসপাতালের সুপারের ঘরেই রাখা ছিল, তা নাকি নিরাপত্তারক্ষীরা জানতেন না। ফলে মাত্র তিন মিনিটের দূরত্বে পৌঁছতে সময় লেগে যায় ৩৩ মিনিট। এই সময়ের মধ্যেই নাগেরবাজারের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিক পাঁজরের হাড় ভেঙে যায় এবং শরীরের অভ্যন্তরে গুরুতর আঘাত লাগে। তবু প্রায় এক ঘণ্টা তিনি জীবিত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। পুলিশের দাবি, চাবি খুঁজতে এতটা সময় নষ্ট না হলে তাঁর চিকিৎসা আরও দ্রুত শুরু করা সম্ভব হত। পুলিশ সূত্রে খবর, ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ওই যুবকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় ‘অনিচ্ছাকৃত খুন’-এর অভিযোগে ইতিমধ্যেই তিন লিফটম্যান ও দুই নিরাপত্তারক্ষীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি এই ঘটনার সঙ্গে আরও কারও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন লালবাজারের গোয়েন্দারা।
সোমবার ফের আর জি কর হাসপাতালে ঘটনাস্থলে পৌঁছন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। যে ট্রমা কেয়ারের লিফটে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়েছিল, সেটি ৬ ও ৭ তলার মাঝামাঝি অবস্থায় আটকে ছিল বলে জানা যায়। পিডব্লুডি আধিকারিকদের উপস্থিতিতেই লিফটটির প্রযুক্তিগত পরীক্ষা করা হয়। এদিকে, লালবাজারের গোয়েন্দারা ইতিমধ্যেই অরূপের স্ত্রী সোনালি বন্দ্যোপাধ্যায়, বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায়, ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তদন্তের পরবর্তী ধাপে লিফট সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত দিক খতিয়ে দেখতে লিফট বিশেষজ্ঞ সংস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাকে নোটিশ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। অন্যদিকে, কর্তব্যরত সিআইএসএফ জওয়ানদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেই কারণে তাঁদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লালবাজারে তলব করা হতে পারে।
মৃত অরূপের বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশকে জানিয়েছেন, বেসমেন্টে আটকে পড়ে তাঁর ছেলে ও পুত্রবধূ সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। অরূপের কয়েকজন বন্ধু বেসমেন্টে নামতে গেলে দেখেন, গেটটি তালাবন্ধ অবস্থায় রয়েছে। তাঁরা নিরাপত্তারক্ষী, লিফটম্যান, হাসপাতালের কর্মী এবং সিআইএসএফ জওয়ানদের কাছে গেট খোলার জন্য বারবার অনুরোধ করেন। তখন তাঁদের জানানো হয়, চাবিটি পিডব্লুডি দফতরের কাছে রয়েছে। তদন্তে পরে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, বেসমেন্টের চাবি আসলে হাসপাতালের সুপারের ঘরেই রাখা ছিল। তবে অনেক নিরাপত্তারক্ষী সে বিষয়ে অবগত ছিলেন না। ফলে তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় চাবির খোঁজ শুরু করেন, কিন্তু কোথাও তা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত এক নিরাপত্তা আধিকারিক জানতে পারেন, চাবিটি সুপারের ঘরেই রয়েছে। জানা যায়, রাতে সুপারের ঘরে একজন অ্যাটেনড্যান্ট দায়িত্বে থাকেন। কিন্তু ঘটনার সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী তাঁকে খুঁজতে শুরু করেন এবং শেষমেশ ঘরের কাছেই তাঁকে পাওয়া যায়। তিনি জেগে উঠে চাবি খুঁজে নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে তুলে দেন। ততক্ষণে প্রায় আধ ঘণ্টা সময় পেরিয়ে যায়। তবে সেই চাবি দিয়েও সব তালা খোলা সম্ভব হয়নি। পরে অন্য একটি পথ দিয়ে বেসমেন্টে পৌঁছে নিরাপত্তারক্ষীরা লিফটের গর্ত থেকে অরূপ, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে উদ্ধার করেন।
গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, তখন সময় ছিল ভোর ৫টা ৯ মিনিট। অরূপের স্ত্রী সোনালি তদন্তকারী আধিকারিকদের জানিয়েছেন, লিফটটি উপরে উঠে যাওয়ার সময় তাঁর স্বামীর শরীরে গুরুতর আঘাত লাগে। সেটি যদি আবার নীচে নেমে আসত, তা হলে তাঁদেরও প্রাণসঙ্কট তৈরি হতে পারত। সেই আশঙ্কা থেকেই তিনি নিজের ছেলেকে লিফটের গর্তের মধ্যেই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটি জায়গায় বসিয়ে রাখেন। পরে উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে অরূপকে স্ট্রেচারে করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। তবে পুলিশের দাবি, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রায় ১৮ মিনিট পরই তাঁর মৃত্যু হয়।
গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ লিফট ও দেওয়ালের মাঝখানে চাপে গুরুতর আহত হন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর লিফটটি আরও উপরে উঠে গেলে তিনি স্ত্রীর চোখের সামনেই নীচে বেসমেন্টের গর্তে পড়ে যান। ওই অবস্থায় তিনি প্রায় ৪০ মিনিট ধরে সেখানে আহত অবস্থায় পড়ে ছিলেন এবং যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর স্ত্রী বারবার সাহায্যের জন্য চিৎকার করে উদ্ধারকারীদের ডাকতে থাকেন। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, উদ্ধার করার পরও অরূপের শরীরে জীবনের লক্ষণ ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় দেরি হওয়ায় চিকিৎসকেরা যথাসময়ে চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া তিন লিফটম্যান লালবাজারে জেরার সময় জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী তাঁরা নিজেরা সুপারের ঘর থেকে বেসমেন্টের চাবি নিতে পারতেন না। কারণ সেখানে থাকা অ্যাটেনড্যান্ট তাঁদের হাতে সেই চাবি তুলে দিতেন না। তাঁদের দাবি, ওই চাবি পাওয়ার অধিকার শুধুমাত্র নিরাপত্তারক্ষীদেরই ছিল। একজন লিফটম্যান জেরায় জানান, তিনি অন্য একটি লিফটে করে বেসমেন্টে নামার চেষ্টা করেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন লিফটের দরজার সামনে একটি গ্রিল লাগানো রয়েছে। আবার আরেকজন লিফটম্যান জানিয়েছেন, তিনি লিফটের মেশিন রুমেও গিয়েছিলেন পরিস্থিতি বোঝার জন্য। তবে কেন একজন লিফটম্যান পরিস্থিতি না বুঝেই লিফটের সুইচ চাপেন এবং সেটি চালানোর চেষ্টা করেন, সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ।





