ব্রিগেডের জনসভা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। শনিবার বিকেলে নরেন্দ্র মোদি-র সভার ঠিক আগেই কলকাতায় তৃণমূল-বিজেপির সংঘর্ষের অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায়। গিরিশ পার্ক এলাকায় রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা-র (Shashi Panja) বাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে। ইট ছোড়া ও ভাঙচুরের ঘটনায় আহত হন মন্ত্রী নিজেও—পিঠে ইটের আঘাত লাগে বলে দাবি তাঁর। আঘাত পাওয়া সত্ত্বেও বিকেলে তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে হাজির হন শশী পাঁজা। দৃপ্ত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আক্রমণ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন—“এটাই কি আপনার নারী সুরক্ষার গ্যারান্টি?” তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। সাংবাদিক বৈঠকে শশী পাঁজার পাশে ছিলেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সায়নী ঘোষ (Sayani Ghosh)। তাঁরা একাধিক ইস্যু তুলে কেন্দ্র ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন।
শনিবার দুপুরের দিকে উত্তর কলকাতার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা ব্রিগেডের উদ্দেশে মিছিল করে রওনা দেন। সেই মিছিল গিরিশপার্ক এলাকায় পৌঁছতেই উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগ, মন্ত্রীর বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ই ফ্লেক্স ছেঁড়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বচসা শুরু হয়, যা পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়। তৃণমূলের দাবি, ব্রিগেডে যাওয়ার নাম করে বিজেপির সমর্থিত দুষ্কৃতীরা পরিকল্পিতভাবে শশী পাঁজার বাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। ইটের আঘাতে বাড়ির জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং মূল দরজারও ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ। ঘটনার পর সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, তাঁকে খুনের চেষ্টা হয়েছে এবং তিনি এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এফআইআর দায়ের করবেন। এছাড়াও এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে এই ঘটনায় আহত পাঁচজন ব্যক্তিকে হাজির করা হয়।

সাংবাদিক বৈঠক থেকে মন্ত্রী দাবি করেন, এই হামলায় তাঁর শরীরের একাধিক অংশে আঘাত লেগেছে। বহিরাগতদের আক্রমণের জেরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও জানান। তবে তিনি এই ঘটনায় পিছিয়ে যাবেন না এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও স্পষ্ট করেন। তাঁর দাবি, কয়েকজন হামলাকারীকে তিনি নিজে চিহ্নিত করেছেন। শশী পাঁজার অভিযোগ, ব্রিগেডে লোক জোগাড় করতে অন্য রাজ্য থেকে মানুষ আনা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, ঝাড়খণ্ড ও বিহার থেকে আসা লোকজনই এই হামলায় যুক্ত। নারী সুরক্ষার কথা বললেও বাস্তবে বিজেপি এক মহিলা মন্ত্রীর বাড়িতে হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর কথায়, ”ওটা ব্রিগেড নয়, বি-গ্রেড সভা ছিল। আর লোক ভরাতে বহিরাগত এনেছিল বিজেপি। ঝাড়খণ্ড, বিহার থেকে দলে দলে লোক এসে এই হামলা চালিয়েছে।” মন্ত্রীর সংযোজন, “এই ঘটনা প্রমাণ করে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকারের মূল লক্ষ্য কী। যারা নারী নিরাপত্তা, সুরক্ষার কথা বলে, তারাই রাজ্যের এক মহিলা মন্ত্রীর বাড়িতে এইভাবে হামলা চালিয়েছে।” মন্ত্রী আরও জানান, তাঁর বাড়ির আশপাশে ‘বয়কট বিজেপি’ লেখা কিছু পোস্টার লাগানো ছিল। ব্রিগেডের পথে যাওয়ার সময় বিজেপি কর্মীরা বাস থেকে নেমে সেই পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেন। প্রতিবাদ জানাতে তৃণমূল কর্মীরা ফের পোস্টার লাগাতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয় বলে দাবি তাঁর।
এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করে বলেন, “আজ ব্রিগেডে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী যে হুমকির সুর চড়িয়েছেন, তার প্রতিফলন আমরা হাতে-কলমে দেখতে পেলাম গিরিশ পার্কে। মন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়িতে বিজেপি কর্মীরা যেভাবে ভ্যান্ডালিজম চালিয়েছে, তা অভাবনীয়। প্রধানমন্ত্রীর কথায় অনুপ্রাণিত ও উদ্বেলিত হয়েই কি এই আক্রমণ?”
নিজের শারীরিক আঘাতের কথা উল্লেখ করে শশী পাঁজা আরও বলেন, “এরা মহিলা বলে কাউকে সম্মান দিতে জানে না। আমি মন্ত্রী না মহিলা- সেটা বড় কথা নয়, একজন মানুষের ওপর সরাসরি পেটে ইট মারা হয়েছে। আমার আগের অস্ত্রোপচারের জায়গায় আঘাত লেগেছে। বিজেপি আসলে খুনি আর গুন্ডা পুষছে। এতদিন জানতাম ওরা সিবিআই-ইডি দিয়ে গণতন্ত্র হত্যা করে, এখন দেখছি ওরা ফিজিক্যালি মেরে ফেলতে চায়।”
ব্রাত্য বসু বলেন, “একজন মন্ত্রীর বাড়িতে দু-তিনজন পুলিশ থাকে। প্রায় ২০০ জনের একটি দল যখন অ্যাটাক করে, পুলিশও রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েছে আজকে।” বিজেপির পাথর ছোড়ার একটি ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে ব্রাত্য বসু বলেন, “এর নামই কি পরিবর্তন? এর নামই কি উজ্জীবন? এর নামই কি বদল?”
এদিনের সাংবাদিক বৈঠক থেকে সায়নী ঘোষ বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেসের ভদ্রতাকে দুর্বলতা ভাবলে খুব মুশকিল হয়ে যাবে। আজকে প্রধানমন্ত্রী এসে বলছেন ‘সবকা হিসাব’ হবে; তা আপনার হিসাব হলে আপনি কোথায় লুকাবেন? এটা আমরা জানতে চাই। বি-গ্রেডের সভাতে ওনাকে দেখা গিয়েছে, এটাই অনেক। বাজেটের অধিবেশন চলছে। যারা গ্যাস পাচ্ছেন না, তাদের বলব- সভাতে চলে যান, জিলিপি আর কচুরি ভাজার জন্য ওখানে ২০০ থেকে ৩০০ সিলিন্ডার রাখা আছে। মানুষকে ভাওতা দিয়ে তো কোনও লাভ নেই। তৃণমূল সপ্তাহে আট-দশটা সভা করে। আপনারা কোনও সভাতে দেখেছেন মন্দিরের কাঠামো বানাতে হচ্ছে? দক্ষিণেশ্বর বা কালীঘাটের কাঠামো বানাতে হচ্ছে? অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ-সেটা ওনারা প্রমাণ করে দিয়েছেন।”





