নতুন সকাল, নতুন দিন, নতুন করে শুরু হোক সব। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩। চৈত্রের অবসানে এল নতুন বছর। চৈত্রসংক্রান্তি বা চড়কসংক্রান্তিতে গোটা বাংলা জুড়ে গাজনের উৎসব, বাঙালির জীবনে এ এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই গাজনই যেন নববর্ষের বার্তা দিয়ে যায়। চড়ক পূজা, চড়ক মেলা এবং নানা আধ্যাত্মিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বছরের শেষটাকে বিদায় জানানো হয়। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। সেই আমেজকে সঙ্গে নিয়ে আপামর বাঙালি পা রাখে আর একটা নতুন বছরে। বাঙালির ১লা বৈশাখ।

বাংলা নববর্ষ মানেই এক নতুন সূচনা। সকাল থেকেই মন্দিরে মন্দিরে ভিড়, মাথায় ঝুড়ি করে লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তি, হালখাতা ও পঞ্জিকা নিয়ে পুজো দেওয়ার জন্য অপেক্ষা, কোথাও আবার প্রভাতফেরি, শোভাযাত্রা, বৈশাখী আড্ডা, মিষ্টিমুখ—এই দৃশ্য খুবই পরিচিত। ব্যবসায়ীদের কাছে এই দিনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হালখাতার মাধ্যমে নতুন হিসাব বছরের সূচনা হয়। দুপুরে বিভিন্ন জায়গায় ভুরিভোজের আয়োজন তো থাকেই, আর বিকেলের দিকে দোকানপাটে ভিড় বাড়ে—মিষ্টিমুখ, নতুন ক্যালেন্ডার আর কেনাকাটার আনন্দে জমে ওঠে হালখাতা উৎসব। গোটা বাংলা উৎসবের আমেজে গা ভাসায়।

তবে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এই সময়টায় নানা রূপে নববর্ষ পালিত হয়। যেমন ত্রিপুরায় (Tripura) পয়লা বৈশাখ উদযাপন করা হয় বাঙালি সংস্কৃতির ছোঁয়ায়। অন্যদিকে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্য পঞ্জাব (Punjab) ও হরিয়ানা (Haryana)-য় পালিত হয় বৈশাখী—যা মূলত ফসল কাটার উৎসব। মাঠভরা ফসল ঘরে তোলার আনন্দে ভাংরা নাচ, গান আর খাওয়াদাওয়ার মাধ্যমে দিনটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।

অসম (Assam)-এ এই সময় পালিত হয় বিহু, বিশেষ করে বোহাগ বিহু বা রঙালি বিহু। এটি নতুন চাষের মরসুম শুরুর উৎসব। বিহু নাচ, গান এবং নতুন পোশাকে সেজে ওঠে অসমবাসী—আনন্দে মেতে ওঠে গোটা রাজ্য। মণিপুর (Manipur)-এ দিনটি পরিচিত সাজিবু চেইরাওবা নামে। নতুন বছরের সূচনায় আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে বিশেষ রান্না পরিবেশন ও তার আগে পুজো করার রীতি রয়েছে। এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে নানা ধরনের সবজি মিশিয়ে তৈরি পদ বিশেষ জনপ্রিয়। ওড়িশা (Odisha)-য় এই উৎসব পানা সংক্রান্তি নামে পালিত হয়, আর বিহার (Bihar)-এ একে বলা হয় ছাতু সংক্রান্তি।

দক্ষিণ ভারতেও এই সময় নানা নামে নববর্ষ উদযাপিত হয়। কেরালা (Kerala)-য় পালিত হয় ভিষু। ভোরবেলায় ‘ভিষু কানি’ সাজানো হয়—চাল, ফল, সবজি, সোনা এবং আয়না দিয়ে। বিশ্বাস করা হয়, ভোরে প্রথমবার এই কানি দেখে দিন শুরু করলে সারাবছর শুভ কাটে। আতসবাজি, উপোস ও বিশেষ খাবারের মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়।

তামিলনাড়ু (Tamil Nadu)-তে এই দিনটি পালিত হয় পুথান্ডু নামে। বাড়িঘর আমপাতা দিয়ে সাজানো হয়, রঙ্গোলিতে সেজে ওঠে আঙিনা। এখানে বিশেষ খাবার ‘আম পাচাদি’—যা টক, মিষ্টি ও তেতোর মিশেলে তৈরি সেটি খাওয়ার রীতি রয়েছে।
সব মিলিয়ে, চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরু—ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একসঙ্গে বয়ে আনে নতুন বছরের আনন্দ, আশা আর উৎসবের রঙিন ছোঁয়া।





