বৃহস্পতিবার কলকাতার ধনধান্য অডিটোরিয়ামে বাংলার জন্য বড়সড় বিনিয়োগের ঘোষণা করলেন শিল্পপতিরা। এদিন এখানেই বসেছিল ‘বিজনেস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কনক্লেভ’, যার সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলায় বিনিয়োগ টানার এ এক নতুন প্রয়াস রাজ্য সরকারের। এদিন এই মঞ্চ থেকেই একের পর এক অর্থনৈতিক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন বাংলা তথা দেশ এমনকি বিদেশি শিল্পপতিরা। গত ১৫ বছরে রাজ্যে ২৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লগ্নির উল্লেখ করে আরপিএসজি (RPSG) গ্রুপের চেয়ারম্যান সঞ্জীব গোয়েঙ্কা (Sanjeev Goenka) আরও প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেন। সঞ্জীব গোয়েঙ্কা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে আরও ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করব। মূলত পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ প্রকল্প, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যেই এই বিপুল অর্থ খরচ করা হবে।“
গত ১৫ বছরের সাফল্যের ধারা বজায় রেখেই এবার নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে সঞ্জীব গোয়েঙ্কার সংস্থা। যার বেশিরভাগটাই বিনিয়োগ হবে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে। এই প্রথম দেশের কোনও রাজ্যে ৫ হাজার মেগাওয়াট আওয়ার (MWh) ক্ষমতার বিশাল ব্যাটারি স্টোরেজ প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে কলকাতা শহর প্রয়োজনীয় মোট বিদ্যুতের অন্তত ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি বা ‘রিনিউয়েবল এনার্জি’ থেকে পাবে, যা দেশের কোনও মেট্রো শহরের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন। বিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি আরপি গোয়েঙ্কা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (RPGIS)-এর দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তৈরির জন্য ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন আরপিএসজি গ্রুপের চেয়ারম্যান। রাজ্যে বিশ্বমানের চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল তৈরি করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের মধ্যে এই হাসপাতালটি চালুর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলেও জানালেন তিনি।
বঙ্গে পর্যটন-পরিষেবায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে বলে এদিন জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘পর্যটন শিল্পে আমরা এখন দেশের মধ্যে দ্বিতীয়।‘ অনেকটা সেই ধাঁচেই হর্ষবর্ধন নেওটিয়া বলেন, “অনেকটাই উন্নত হয়েছে বাংলার পর্যটন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্র। হসপিটালিটি ক্ষেত্রে রায়চকে একটি হোটেল দিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন যার নাম ‘তাজ গঙ্গা কুটির’। এই মুহূর্তে বাংলায় সুনামের সঙ্গে আমরা ৭টি হোটেল চালাচ্ছি। আরও ১০টি হোটেল তৈরির চিন্তাভাবনা চলছে। ৪টের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে।“ স্বাস্থ্য খাতে নেওটিয়া গ্রুপের বিনিয়োগের খতিয়ান তুলে ধরেন তিনি। ১টি হাসপাতাল দিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা শুরু করার পর এখন বাংলায় তাদের ৩টি হাসপাতাল রয়েছে। নেওটিয়া ভাগীরথী ওমেন অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার সেন্টার’ নিউটাউন ক্যাম্পাসে একটি অত্যাধুনিক শিশু চিকিৎসা কেন্দ্র চালু করেছে। শিশুদের চিকিৎসার জন্য এখানে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি, নিউরোলজি, গ্যাস্ট্রোএনটেরোলজি, ইউরোলজি এবং অর্থোপেডিকের মতো বিভাগ চালু করা হয়েছে। আছে বিশেষভাবে তৈরি পেডিয়াট্রিক ক্যাথ ল্যাব, কার্ডিয়াক সার্জারি ওটি, ডায়ালিসিস ইউনিট এবং সিটি স্ক্যান, এমআরআই সহ নানা আধুনিক মেশিন। দুর্গাপুর, তারাতলা ও নিউটাউনে আরও ৩টি হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বিগত ১৫ বছরে তাঁদের ব্যবসায়িক বিনিয়োগের যার ৭০ শতাংশই বাংলার জন্য দাবি করে হর্ষবর্ধন বলেন, ”আমাদের আসল ব্যবসা সিমেন্ট। তার ভিত্তি মুম্বই হলেও আমি আনন্দিত যে বাংলায় সাঁকরাইল ও ফারাক্কাতে আমাদের দুটো ইউনিট রয়েছে। আমার জন্মস্থান বাংলায় সিমেন্টের হেডকোয়ার্টার করতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত।“ ২০১৫ সালে শিক্ষাক্ষেত্রে নেওটিয়া বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে যাত্রা শুরু করেছে এই গ্রুপ। সেই প্রসঙ্গ টেনে সংস্থার কর্ণধার বলেন, “শুরুতে সেদিন ছিল মাত্র ৪০ জন। আজ ৪ হাজার পড়ুয়া এই বিশালাকায় ক্যাম্পাসে পড়ছে।“ আগামী ৩-৪ বছরের মধ্যেই ৮ হাজার পড়ুয়া ভর্তি হতে পারবে বলে আশাপ্রকাশ করছেন তিনি।
এদিনের সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসা শোনা গেল টিটাগড় রেল সিস্টেমের ভাইস চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর উমেশ চৌধুরীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, “ফলতাতে আমাদের যে ওয়াগন কারখানা আছে সেখানে মাল যাওয়া আসা নিয়ে খুব সমস্যা ছিল। আমাদের সেখানে ‘একসেস’ ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী নিজে জেলা পর্যালোচনা বৈঠকের সময় দায়িত্ব নিয়ে ঠিক করিয়েছেন। এখন তাই আমরা অনেকটাই উন্নতি করতে পেরেছি।“ ৩ বছর আগে মুখ্যমন্ত্রী প্যাসেঞ্জার ট্রেনের কোচ বানানোর কারখানার শিলান্যাস করেছিলেন। জমি নিয়ে কিছু সমস্যা হচ্ছিল। সরকারের থেকে সম্প্রতি লিজে জমি পেয়েছে সংস্থা। তাই বছরে ১ হাজার মেট্রো ও বন্দে ভারত কোচ তৈরির পরিকল্পনার কোথা জানালেন তিনি।
এছাড়াও ফলতায় একটা শিপইয়ার্ড টইরির পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থার। এখানে বছরে ১৬ থেকে ১৮টি স্পেশালাইস্ড জাহাজ তৈরি হবে। আগামী ১ বছরের মধ্যেই উৎপাদন শুরুর আশাপ্রকাশ করলেন তিনি। প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে দাবি করে উমেশের প্রতিশ্রুতি, “কথা দিচ্ছি আমরা বাংলাকেই প্রাধান্য দেব। মেক ইন ইন্ডিয়ার মত মেক ইন বেঙ্গলকে এগিয়ে নিয়ে যাব।”





