ফের আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পেল বাংলার প্রকল্প। অনুর্বর জমিতে কৃষিকাজের উন্নতির জন্য বাংলায় ‘মাটির সৃষ্টি’ প্রকল্প চালু করেছিল রাজ্য সরকার। এবার সেই প্রকল্পকে স্বীকৃতি দিল রাষ্ট্রপুঞ্জ (United Nations)। পাশাপাশি, সুগন্ধি চাল— গোবিন্দভোগ, তুলাইপাঞ্জি এবং কনকচুরকে আন্তর্জাতিক ‘খাদ্য ও সংস্কৃতি ঐতিহ্য’ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই খুশির খবর বুধবার সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তিনি লেখেন, ‘এই গৌরব আমি গ্রামবাংলার সকল মানুষ, বিশেষ করে বাংলার কৃষক ভাই-বোনদের উৎসর্গ করছি।’
মাটির সৃষ্টি প্রকল্প ও গোবিন্দভোগ, তুলাইপাঞ্জি এবং কনকচুরকে স্বীকৃতি দিয়েছে রাষ্ট্রসংঘের ফুড ও এগ্রিকালচার অরগানাইজেশন বা এফএও। এই মর্মে রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেলের থেকে শংসাপত্র এসে পৌঁছেছে নবান্নে। রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে রুক্ষ জমিকে চাষযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যেই বছর কয়েক আগে এই প্রকল্পের সূচনা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই উদ্যোগই এবার বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হওয়ায় স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত তিনি।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়ায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের কৃষি সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেলের পাঠানো শংসাপত্রগুলি শেয়ার করেছেন। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, ‘অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, UN আবারও আমাদের একটি পথিকৃৎ উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউনাইটেড নেশনসের Food and Agriculture Organization (FAO) আমাদের ‘মাটির সৃষ্টি’ কর্মসূচিকে দিয়েছে এই আন্তর্জাতিকভাবে মূল্যবান স্বীকৃতির শংসাপত্র।‘ ২০২০ সালে মূলত বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বীরভূমের মতো জেলাগুলির রুক্ষ জমিকে কাজে লাগানোর জন্য এই প্রকল্পের সূচনা হয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘‘আমাদের রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে ২০২০ সালে আমরা যে পথপ্রদর্শক ‘মাটির সৃষ্টি’ প্রকল্প শুরু করেছিলাম, তার বিপুল সাফল্যের জন্যই আন্তর্জাতিক স্তরের এই প্রশংসাপত্র।’ এই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল পতিত ও অনুর্বর জমিকে কেবল চাষযোগ্য করাই নয়, বরং সেখানে উদ্যানপালন ও মৎস্যচাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা ৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘প্রাকৃতিক ঐতিহ্য এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কার্যকর এই বহুমুখী প্রকল্পটিকে একটি অনন্য জনমুখী উদ্যোগ হিসেবে UN স্বীকৃতি দিল।‘
তিনি আরও যোগ করেছেন, ‘‘আমাদের মূল লক্ষ্য পশ্চিমাঞ্চলের রুক্ষ, অনুর্বর এবং একফসলি জমিকে উর্বর, বহুফসলি, ও বছরভর চাষযোগ্য করে তোলা। সুজলা ও উর্বর এইসব জমিতে এখন শাকসবজির ফলন ও ফলের চাষও হচ্ছে।‘ পুকুর খনন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে যে কয়েক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, সে কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে কেবল ‘মাটির সৃষ্টি’ নয়, বাংলার কৃষিজাত পণ্যের সম্ভারও এবার আন্তর্জাতিক মানের তকমা পেল। মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘আমি আনন্দের সঙ্গে আরও জানাচ্ছি যে, UN-এর পাশাপাশি বাংলার বিখ্যাত সুগন্ধি চাল— গোবিন্দভোগ, তুলাইপাঞ্জি এবং কনকচুরকে আন্তর্জাতিক ‘খাদ্য ও সংস্কৃতি ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।‘ প্রসঙ্গত, এই তিন প্রকার চাল বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের তুলাইপাঞ্জি এবং দক্ষিণবঙ্গের গোবিন্দভোগ চালের কদর বিশ্বজুড়ে। সেই ঐতিহ্যকেই এবার সিলমোহর দিল রাষ্ট্রপুঞ্জ।
স্বাভাবিকভাবেই বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শাসকদলের কাছে বড় হাতিয়ার। বিরোধীরা যখন রাজ্যের কৃষি ও শিল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তখন এই আন্তর্জাতিক শংসাপত্র নিঃসন্দেহে রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের দলিল হিসেবেই উঠে এল। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষে এই সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন বাংলার সাধারণ মানুষকে। তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে এইসব আন্তর্জাতিক সম্মান বাংলার কাজের এক বিশাল স্বীকৃতি ৷ এই গৌরব আমি গ্রামবাংলার সকল মানুষ, বিশেষ করে বাংলার কৃষক ভাই-বোনদের উৎসর্গ করছি।‘ নবান্ন সূত্রে খবর, আগামী দিনে এই স্বীকৃতিকে পাথেয় করে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ‘মাটির সৃষ্টি’ প্রকল্পের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্যের।





